খাতায় ০, ফলে ৪৫: চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পুকুরচুরি, ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম :

শেয়ার করুন

এসএসসি পরীক্ষার খাতার সৃজনশীল অংশে নম্বর পেয়েছেন ‘শূন্য’, অথচ প্রকাশিত ফলাফলে সেই বিষয়েই এসেছে ৪৫ নম্বর! খাতা পুনঃনিরীক্ষণ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এমন ভয়াবহ জালিয়াতি ও পুকুরচুরির ঘটনা ধরা পড়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে ১০ বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়ার প্রমাণ মেলায় সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষার্থী ও বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানায় মামলাটি দায়ের করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন।

মামলার আসামিরা হলেন:

আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী: হাসিবুল আলী শোভন বোর্ডের কর্মচারী: কম্পিউটার সেলের ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, রাশেদুল ইসলাম ও নূর হোসেন রায়হান।

যেভাবে ধরা পড়ল জালিয়াতি:

চলতি বছরের ১০ আগস্ট এসএসসির ফল প্রকাশিত হয়। ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে খাতা পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ ছিল। অভিযুক্ত শোভনের পক্ষ থেকেও পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। আবেদনের পর খাতা পুনঃনিরীক্ষণ করতে গিয়ে পরীক্ষক দেখতে পান, উত্তরপত্রের মূল নম্বরের সঙ্গে ডাটাবেজ ও প্রকাশিত ফলাফলের কোনো মিল নেই। বিষয়টি বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত।তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপের সন্ধান মেলে। দেখা যায়, ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় মূলত ১০টি বিষয়ে ফেল করেছিলেন। কিন্তু কম্পিউটার সেলের কর্মচারীদের যোগসাজশে নম্বর পাল্টে তাকে সব বিষয়ে পাস দেখিয়ে ফল প্রকাশ করা হয়।
নম্বরের ভয়াবহ গড়মিল:

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ১১টি পত্রের সৃজনশীল অংশে নম্বর বাড়ানো হয়েছে:
পদার্থ বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত: উভয় বিষয়ের খাতা বা উত্তরপত্রে ‘০’ (শূন্য) পেলেও ফলাফলে বসানো হয়েছে যথাক্রমে ৪৫ ও ৪৬ নম্বর!ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্র: ১ম পত্রে ৩৩-এর স্থলে ৮৩ এবং ২য় পত্রে ২০-এর জায়গায় দেখানো হয়েছে ৮২।
বাংলা ১ম ও ২য় পত্র: ১ম পত্রে ২৩-এর জায়গায় ৩৩ এবং ২য় পত্রে ২৪-এর বদলে বসানো হয়েছে ৬২।
গণিত ও জীববিজ্ঞান: গণিতে ৯ পেয়ে ফলাফলে ৬৬ এবং জীববিজ্ঞানে মাত্র ১ পেলেও দেখানো হয়েছে ৪৬ নম্বর।অন্যান্য বিষয়: ইসলাম শিক্ষায় ৭-এর জায়গায় ৬৪ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ে ৪-এর স্থলে ৬৫ নম্বর বসিয়ে পাস করানো হয়।

আরও পড়ুন  নালায় নিখোঁজ শিশুর মরদেহ মিলল চাক্তাই খালে

বোর্ড ও পুলিশের বক্তব্য:

মামলার বাদী ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানান, অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী একাদশে ভর্তির আগেই ওই শিক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিলে মন্ত্রণালয় থেকে মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়, যার প্রেক্ষিতে এ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজম্মেল হক মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শিক্ষা বোর্ডের তিন কর্মচারী ও এক পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এজাহার গৃহীত হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুনরাবৃত্তি ঘটছে জালিয়াতির:

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফলে এমন পুকুরচুরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নগরীর একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নক্ষত্র দেব নাথের জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। নক্ষত্র ছিলেন বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর নক্ষত্র দেবের ফলাফল বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সুপারিশে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হলে সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

;