পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সিন্ডিকেট!

পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে ২৫ বছরেও চাকরি স্থায়ী হয়নি ৮৫০ জনের!

মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বিশেষ প্রতিনিধি।।

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিনটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড সারা দেশে জ্বালানি তেল বিপণনের কাজে নিয়োজিত। তিনটি প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড একসময় দেশের জ্বালানি খাতের প্রায় অর্ধেকই বিপণন করত প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি নানান অনিয়ম- দুর্নীতি অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারনে ডুবতে বসেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের জুনিয়র আইটি অফিসার হিসেবে ২০১২ সালের নভেম্বরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান শহিদুর রহমান। এর পর থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। একই পদে শহিদুরের মতো চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়ে কর্মরত আছেন আরও ২৭ জন। কিন্তু চাকরির দীর্ঘ সময় পার করলেও স্থায়ী করা হয়নি তাঁদের।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড অস্থায়ী শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ পরিষদ হেড অফিস” নামে ফেসবুক পেইজে লিখেছেন,শুধু চুক্তিভিত্তিক নয়, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এ সারা বাংলাদেশে ৮৫০ জন এর ও অধিক অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলোতে ১০-২৫ বছর এর ও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছে অনেক শ্রমিক, যাদের স্থায়ীকরণের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। নামমাত্র ৪২৫ টাকা হাজিরা দিয়ে অস্থায়ী শ্রমিকদের তারা পরিচালনা করছেন। কোন প্রকার ছুটি, চিকিৎসা, মেডিসিন,উৎসব বোনাস, উৎসব ভাতা শ্রমিকদের প্রদান করা হয় না।দীর্ঘদিন চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে অনেক শ্রমিকের চাকরি স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা বয়স হারিয়েছেন আবার অনেকেই মারাও গেছেন।

বিগত স্বৈরাশাসক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আওয়ামী লীগের দোসর ও সাবেক মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এর বোনজামাই মাসুদুর রহমান কোম্পানির অস্তিত্ব নষ্ট করেছে ফেলেছে। তার আমলে যে নিয়োগ গুলো হয়েছে ওই নিয়োগে কোম্পানিতে কর্মরত অস্থায়ী এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণের কোন ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করেননি। কোম্পানির প্রত্যেকটি কাজে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি দলীয়করণের ব্যবস্থা করেছেন।

আরও পড়ুন  কর্নফুলীতে ‘ভাসমান গুদামে’ দুদকের অভিযান

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন,কর্মচারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে কথা বলবেন শ্রমিক নেতারা । কিন্তু সিবিএ নেতারা পদ পদবী ব্যবহার করে দলের প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে অনেকেই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন । যার মধ্যে অন্যতম দুর্নীতিবাজ কর্মচারী সাবেক সিবিএ সাধারণ সম্পাদক ও সুপারভাইজার মো. নাসির উদ্দিন।

চুক্তিভিত্তিক লোক নিয়োগ- বাণিজ্য ও তেল চুরির সম্রাট দুর্নীতিবাজ সাবেক সিবিএ নেতা মো. নাসির উদ্দিন। যার দাপটে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নতজানু ছিলেন। আবার প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্মচারী শ্রমিকদের বিরল সিন্ডিকেটও রয়েছে। যার নেপথ্যে রয়েছেন সাবেক সিবিএ নেতা নাসির উদ্দিন।

সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ নানান অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে গত বছরে ২৬ মে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক অধিদপ্তর মহাপরিদর্শক বরাবর দুর্নীতিবাজ কর্মচারী নাসির উদ্দিন, অফিস সহকারি আরিফ মো. হাসান আজম, সহকারি মহাব্যবস্থাপক (প্রধান স্থাপনা) প্রকৌশলী মো. মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, কর্মচারির ইনচার্জ (ই.আর) সহকারী ব্যবস্থাপক আমিনুল হক, পতেঙ্গা গুপ্তখালের সিকিউরিটি অফিসার মো. শাহজাহান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারি মো. হারুন চৌধুরী ও মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান,জিএম (অপারেশন) আসিফ মালিক, সহকারি মহাব্যবস্থাপক (প্রধান স্থাপনা) প্রকৌশলী মো. মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, কর্মচারির ইনচার্জ (ই.আর) সহকারী ব্যবস্থাপক আমিনুল হকের আশ্রয় প্রশ্রয়ে নাসির উদ্দিন ব্যাপক দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে। আবার তাদের রয়েছে তেল চুরির একটি বিরল সিন্ডিকেট।

জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে দুদকের তালিকাভুক্ত কমপক্ষে ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি ও প্রাইজ পোস্টিং দেয়ার অভিযোগ রয়েছে । সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শাস্তির বদলে পুরস্কার দেয়ায় কোম্পানির অভ্যন্তরে ক্ষোভ বাড়ার পাশাপাশি ক্রমশে দুর্নীতির দৌরাত্মা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোম্পানির চাকরি প্রবিধানমালা ২০২১ এবং ২০১৯ সালের বোর্ড অব ডিরেক্টরদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্তদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল পূর্বক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। এরপরও ৮৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি আটকে আছে বছরের পর বছর।

আরও পড়ুন  পটিয়ায় বিএনপি নেতা আবছার উদ্দিন সোহেলের মানবিক সহায়তা

অভিযোগ উঠেছে,প্রতিষ্ঠানের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজশে মোটা অংকের নিয়োগ-বাণিজ্যের টাকার বিনিময়ে কোম্পানিতে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী চুক্তিভিত্তিক থেকে স্থায়ীকরন করা হলেও। ৮৫০ জনের বিষয়টি রহস্যজনকভাবে আটকে আছে।

জানা গেছে, বর্তমানে পদ্মা অয়েলে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা বাবদ পাচ্ছেন ৩০ হাজার টাকা। আর কর্মচারীরা পান ১০-১২ হাজার টাকা। পদ্মা অয়েলের ২৭ জন কর্মকর্তা ৮৯ জন কর্মচারী ও ৮৫০ জন অস্থায়ীদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হচ্ছে না রহস্যজনক কারণে। এতে তাঁরা কোম্পানির ৫ শতাংশ লভ্যাংশ, চিকিৎসা ভাতা, ছুটিসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যেখানে কোম্পানির একজন স্থায়ী শ্রমিক, স্টাফ ও গাড়িচালক বেতন-ভাতাসহ মাসে ৫০-৭০ হাজার টাকা পান, সেখানে একজন অস্থায়ী শ্রমিক পান মাসে মাত্র ১০-১২ হাজার টাকা। একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা পাচ্ছেন মাসে ৩০ হাজার টাকা, অন্যদিকে একজন স্থায়ী কর্মকর্তা পান ৭৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুক্তিভিত্তিতে পদায়িত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান,স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সমান তালে চাকরি করলেও তাঁদের স্থায়ী করা হচ্ছে না। বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে শতাধিক পদ খালি রয়েছে আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ী না করে এখন নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে কথা বলতে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।এমনকি হোয়াটসঅ্যাপের ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোন প্রকার রেসপন্স করেননি ।

((বিশেষ দ্রষ্টব্য: শীঘ্রই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ করা হবে চোখ রাখুন সাপ্তাহিক “পূর্বধারা ” পত্রিকায়।)

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন