নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন পুরাতন রেল স্টেশন সংলগ্ন চোরাই মার্কেটকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাত দল,ছিনতাইকারী,ঝাপটাবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য!

নগরীর কোতোয়ালি টু টাইগারপাস পর্যন্ত সঙ্ঘবদ্ধ চোর চক্রের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য!

ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন:

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার নিউমার্কেট,নতুন ও পুরাতন রেল স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকা থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত পুরাতন রেল স্টেশন সংলগ্ন চোরাই মার্কেটকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাত দল, মোবাইল চোর চক্রের সিন্ডিকেট, ছিনতাইকারী ও ঝাপটাবাজের দৌরাত্ম্য মাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন এই এলাকা থেকে শত শত মানুষের নামিদামি বিভিন্ন ব্রান্ডের মোবাইল, মানিব্যাগ, গুরুত্বপূর্ণ মালামাল সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাত, চোর চক্র ও ঝাপটাবাজরা প্রকাশ্য দিবালোকে বাসেরযাত্রী ও পথচারীদেরকে জিম্মি করে লুট করে নিয়ে নিচ্ছে। অনেকটা নিরুপায়ে পথ চলেন পথচারীরা।দেখার জন্য কেউ নেই।

কোতোয়ালি ও নিউমার্কেট মোড় এলাকা থেকে যাত্রীরা গাড়িতে উঠলেই এসব ডাকাত দলের চক্র ও ঝাপটাবাজরা গাড়ির যাত্রী কিংবা পথচারীদেরকে টার্গেট করে তাদের সর্বস্ব লুটপাট করে ছিনিয়ে নিচ্ছে। বেশির ভাগ সময় এসব এলাকায় সঙ্গবদ্ধ চোর চক্র ঠেলাঠেলি করে গাড়িতে উঠেই যাত্রীদের ও মোবাইল, মানিব্যাগ ও মূল্যবান জিনিসপত্র প্রকাশ্যে ছিনতাই করে নিয়ে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে কেউ এর প্রতিবাদ করলে সঙ্ঘবদ্ধ চোর চক্রের সদস্যরা উল্টো ভুক্তভোগীকে চোর সাজিয়ে গণপিটুনি দিয়ে থাকেন।

১১ জুন (বুধবার) দুপুর আনুমানিক ১২ টার সময় নিউমার্কেট মোড় থেকে আগ্রাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রীবাহি ৬ নং বাসে উঠেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চট্টগ্রামের জেএম শাখায় কর্মরত জেপি নুরুল মুহাম্মদ কাদের। ঈদ পরবর্তী সময়ে শহরে মানুষের চলাচল অনেকটা সীমিত। বাসে সিট থাকায় অন্য দশজনের মত তিনিও গন্তব্যস্থানে যাচ্ছিলেন । বাসটি পুরাতন রেলস্টেশনে আসার পর যাত্রী সেজে ১০-১২ জন লোক ঠেলাঠেলি করে গাড়িতে উঠেই প্রকাশ্যে দিবালোকে তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেন। কোন উপায় না দেখে অবশেষে তিনি কোতোয়ালি থানায় সাধারন ডায়েরি ( জিডি নং -৬৯৬) করেন।

নুরুল মুহাম্মদ কাদের বলেন, নিউমার্কেট মোড় থেকে আগ্রাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রীবাহি ৬ নং বাসে বসি। বাসটি পুরাতন রেলস্টেশন আসার পর দেখলাম বেশ কয়েক জন লোক ধাক্কাধাক্কি করে গাড়িতে উঠেই আমার সিটের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার মোবাইলে অফিসের জরুরি ক্ষুদে বার্তা আসে। মোবাইল বের করে বার্তাটি দেখার সময় ফলমন্ডি এলাকায় অনেকটা ডাকাতির স্টাইলেই আমার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেন তারা। তাদের মধ্য থেকে একজনকে আমি ধরে ফেললেই ওই সময় অন্যান্য ডাকাত দলের সদস্যরা আমাকে ঘিরে ফেলে। রাস্তার আশেপাশে পুলিশের কোন উপস্থিতি না দেখে এবং বাসের অন্য যাত্রীরা সহযোগিতা না করায় নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে নীরবে সহ্য করে গাড়ি থেকে নেমে কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করি । তিনি আরোও বলেন, থানায় এসে দেখতে পাই আমার মত আরো বেশ কয়েকজন মানুষও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে এসেছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ফোনটি উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন মর্মে আশ্বস্ত করেন | এসব চিহ্নিত এলাকায় টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি ডাকাত দল ও চোর চক্র সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা জরুরী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঈদ পরবর্তী রাস্তাঘাটে শহরমুখী মানুষের বাড়তি ভিড় থাকে। মূলত এসব সুযোগকে আরো বেশি বেশি কাজে লাগিয়ে এসব চোর চক্র রাস্তায় চলাচলত পথচারী ও যাত্রীবাহী বাসের মানুষের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছেন তারা।

আরও পড়ুন  রাঙ্গুনিয়ায় দুর্বৃত্তদের হামলায় আ.লীগের সভাপতির মৃত্যু

জানা যায়, এসব এলাকায়, সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাত দল, চোর চক্র, পকেটমার, ছিনতাইকারী, ঝাপটাবাজদের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা নেশা জাতীয় দ্রব্য বেচাকেনা থেকে শুরু করে নানান অপরাধের যুক্ত রয়েছেন। এরা বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে যাত্রীবাহী বাস এবং পথচারীদেরকে টার্গেট করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মালামালসহ মোবাইল মানিব্যাগ ছিনতাই করে সর্বস্ব কেড়ে নেন ।
তবে চুরিকৃত এসব মালামাল গুলো বিক্রি হয় ‘ওপেন সিক্রেট’ চোরাই মার্কেটে।অন্য কোনো নাম নেই, বলা হয় ‘চোরাই মার্কেট’। চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার নতুন ও পুরাতন রেল স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকা এবং আশপাশের ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে এ মার্কেট। এখানকার দোকানিদের কাছে ঠিকানা জানতে চাইলেও তারা অকপটে জানায়, ‘চোরাই মার্কেট’।
চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ মানুষ জানেন, ঘর বা দোকান থেকে চুরি করা; যা-ই হোক না কেন, চোরাই মার্কেটে একবার ঢুঁ দিলে নগদের বিনিময়ে কিছু জিনিস ফেরত পাওয়া যেতে পারে। তবে জিনিসটা নিজের বাসা কিংবা দোকানের এমন দাবি করলে উল্টো গণপিটুনি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে নিশ্চিত। চোরাই মার্কেটে কারা ব্যবসা করেন, এসব পণ্য কোথা হতে আসে কিছুই অজানা নয় পুলিশের। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানগুলোর বেশির ভাগই লোকদেখানো। অভিযানের পর দিনকয়েক সাবধানে চলে ব্যবসা। তারপর আবার শুরু হয় পুরোদমে।

চট্টগ্রামের প্রধান রেলওয়ে স্টেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন রুটের বাসের কাউন্টার রয়েছে নিউমার্কেট এলাকায়। এ কারণে চোর, ছিনতাইকারী বা পকেটমারের আনাগোনা বেশি আছে এ জংশনে। পুরাতন কাপড়ের পাশাপাশি চোরাই ঘড়ি, ব্যাগ, কাপড়, জুতাও বিক্রি শুরু করেন দোকানিরা। সময়ের পরিক্রমায় চোরাই মালামালের নিরাপদ বিক্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয় ব্যস্ত এলাকাটি। চোরা মালামাল বিক্রির পরিসর আশপাশের এলাকাও ছাড়িয়ে গেছে।
মোবাইলের যুগে পরিচিত পায় চোরাই মার্কেট:
চোরা মার্কেটের ব্যাপক প্রসার ও পরিচিতি পায় ২০০০ সালের পরে। দেশের মোবাইল ফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে জমজমাট হয়ে ওঠে বেচাকেনা। পকেটমার থেকে ছিনতাই অথবা বাসা-বাড়ি থেকে চুরি যাওয়া সব মোবাইল এখানে এনে বিক্রি করা হতো। অল্প দামে মোবাইল বিক্রির কারণে দ্রুত পরিচিতি পায়। পুরাতন স্টেশন থেকে নতুন স্টেশন পর্যন্ত কয়েকশো মিটার এলাকার ফুটপাতজুড়ে শতাধিক দোকানে শোভা পায় হাজার হাজার চোরা মোবাইল। বাটন মোবাইল থেকে শুরু করে নামী ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন বেচাকেনা হয়। চার্জার, ক্যাবল, ব্যাটারি বা ইয়ারফোনের মতো আনুষঙ্গিক উপকরণও এখানে বিক্রি হয়। মোবাইল চুরির পর আইএমইআই নাম্বার পরিবর্তন করে বিক্রি করা হয়।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে স্বর্ণ ও নগদ অর্থ নিয়ে কর্মচারী লাপাত্তা

২০২০ সালে নগরীর মোবাইল ছিনতাইয়ের ১২টি চক্রের সন্ধান পেয়েছিল পুলিশ। পাশাপাশি চোরাই মোবাইল কেনা বেচা চক্রের অর্ধশত ব্যবসায়ীর নাম পরিচয় সম্পর্কেও নিশ্চিত হয় পুলিশ।

সেই সময়ে টিম কোতোয়ালী দুই দিন ধরে অভিযান চালিয়ে মোবাইল ছিনতাই চক্রের আট সদস্য এবং চোরাই মোবাইল কেনা বেচা চক্রের তিন সদস্যসহ মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। উদ্ধার করে ২০২টি মোবাইল। গ্রেপ্তারকৃতরা ছিলেন মো. ফজলুল করিম (৩৫), মো. শাহ আলম (৩০), মহিউদ্দিন (২৭), ইয়াকুব হোসেন সাইমন (১৯), রাজিব হোসেন (২৭), মো. সাজ্জাদ (২২), মিজানুর রহমান রাকিব (২০), মো. শাহাদাত (২২), শাকিল (২৪), দুলাল (২০) এবং রবিন (২৩)। এদের মধ্যে প্রথম তিন জন চোরাই মোবাইল কেনা বেচা চক্রের সদস্য আর বাকিরা ছিনতাইকারী।
দীর্ঘদিন ধরে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন পুরাতন রেল স্টেশন সংলগ্ন চোরাই মার্কেটকে কেন্দ্র করে নগরীর ছিনতাইকারী, ঝাপটাবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে টেনশনে ছিল টিম কোতোয়ালী। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী, চোরাই মোবাইল বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেও জামিনে ফিরে তারা একই পেশায় জড়িয়ে পড়ে। গত ২ ডিসেম্বর ২০২০ সালে কোতোয়ালীর মোড় থেকে টাইগার পাস মোড় পর্যন্ত এসি কোতোয়ালী নোবেল চাকমার নেতৃত্বে ও ওসি কোতোয়ালী মোহাম্মদ মহসীনের নেতৃত্বে অভিযান চালায় টিম কোতোয়ালী।

ডাকাত দল, ঝাপটাবাজ ও চোর চক্রের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে এসি কোতোয়ালি মো: মাহফুজুর রহমান থেকে জানতে চাইলে তিনি জানান,স্টেশন রোড, টাইগার পাস,কোতোয়ালি,আলমাস,এসব এলাকায় নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর , আশরাফুল আলম জানান, মুহাম্মদ নুরুল কাদেরের মোবাইল ফোন হারিয়ে গেছে মর্মে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন থানায়। ফোনটি উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ঈদের ছুটি থাকার কারণে এসব এলাকায় পুলিশের টহল কিছুটা কম আছে। তবে বিভিন্ন সময় চিহ্নিত এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বাস কিংবা অন্যান্য পরিবহনে যাত্রীরা যেন গাড়ির জানালার পাশে কানে মোবাইল ফোন না রেখে পকেটেই যেন রাখেন। যাত্রীদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার তাগিদও দেন তিনি। ১১ জুন কয়জন মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়ার ডায়েরি করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান জানা নাই তবে ৩-৪ জনের মত হবে।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে অস্ত্র উদ্ধার, আসামি গ্রেফতার

অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামসুল ইসলাম বিপি বলেন,আমাদের কাছে এমন কোন প্রযুক্তি নাই তাৎক্ষণিকভাবে আইডেন্টিফাই করে মোবাইল খোজে বের করা। তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি। মোবাইল ফোনটি উদ্ধারে প্রচেষ্টা চালি যাচ্ছি ।।

এই বিষয়ে জানতে, কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন