আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: কারাবাস, ফাঁসির রায় ও মৃত্যুর বেদনাবহ অধ্যায়

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চিকিৎসায় অবহেলা ও জনগণের ভালোবাসায় ভাসমান বিদায়

নূর মোহাম্মদ।

শেয়ার করুন

এক আলোকবর্তিকার জীবন বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার জীবন শুধু ব্যক্তিগত নয়—তা হয়ে উঠেছে যুগের দলিল ও প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, মুফাসসিরে কুরআন ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমীর হিসেবে তিনি অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কুরআনের তাফসির, দাওয়াত ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।তাঁর তাফসিরের কণ্ঠস্বর ছিল হৃদয়ছোঁয়া, বক্তব্যে ছিল দৃঢ়তা, প্রজ্ঞাময় ও সাবলীল । সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এবং আলেম হিসেবে জনসমাবেশে তিনি ছিলেন ন্যায় ও সত্যের অদম্য কণ্ঠস্বর।

ফাঁসির রায়ের নাটক ও গণআন্দোলন ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তথাকতিৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় শুধু আদালত কক্ষেই নয়, পুরো দেশকেই নাড়া দিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়।এই রায়কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া গণআন্দোলনে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ শহীদ হন—যা পৃথিবীর বিচার ইতিহাসে বিরল।তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কঠোর দমননীতি চালায়; দেশের নানা প্রান্ত রক্তে রঞ্জিত হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল ইসলামি নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার এক নগ্ন প্রচেষ্টা

শেষ মুহূর্তের অবহেলা ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন আল্লামা সাঈদী। তাঁকে ঢাকার পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করা হলেও অভিযোগ রয়েছে—চিকিৎসায় ছিল চরম অবহেলা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রী ও সন্তানদের শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি। সেদিন রাতেই তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)।

ঢাকায় জানাজার সুযোগ না দিয়ে দমন অভিযানমৃত্যুর পর ঢাকায় জানাজা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি। লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতা এ দাবি জানাতে রাস্তায় নামলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি চালিয়ে শত শত মানুষকে আহত করে।অবশেষে তাঁর মরদেহ নিজ জন্মস্থান পিরোজপুরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে লাখো মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে প্রিয় নেতার জানাজায় অংশ নেয়।

আরও পড়ুন  হামের বাড়তি প্রকোপ: বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও করণীয়

এক অবিনশ্বর উত্তরাধিকার আল্লামা সাঈদীর রেখে যাওয়া তাফসির, ইসলামী সাহিত্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে মানুষকে আলোর পথে পরিচালিত করবে। তাঁর জীবনদর্শন ছিল—“ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।”

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অবিচারের শিকার এই মৃত্যু ইতিহাসে এক বেদনাবহ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবুও তাঁর কর্ম ও ত্যাগ মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে—যেমন রাত যতই গভীর হোক, ভোরের আলোকে নিভিয়ে রাখা যায় না।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন