পটিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার সারাদিনব্যাপী চলেছে আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে ভরা এক অবিস্মরণীয় দিন। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর বিদায় উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্কুল মিলনায়তন মুখরিত হয়ে উঠেছিল হাসি, গান, নাচ আর কান্নার সুরে।
সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সেজেছিল বর্ণিল সাজে। ফেস্টুন, বেলুন আর ফুলে ফুলে ছিল যেন বসন্তের আগমন। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকদের হাতে তৈরি কার্ড, ফুলের তোরা আর চোখের জলে ভেজা চিঠি উপহার দিয়ে বিদায় জানাতে এসেছিল।
অনুষ্ঠান শুরু হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে। এরপর শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল কবিতা আবৃত্তি, দেশের গান, নৃত্য আর নাটিকা। প্রতিটি পরিবেশনার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল ‘আর তো ফিরব না এই স্কুলে’ এমন আবেগের সুর।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে এসে আবেগের বাঁধ ভেঙে পড়ে। শিক্ষার্থীরা একে একে তাদের প্রিয় শিক্ষকদের কাছে এসে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। অনেক শিক্ষকও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। পাঁচ বছর ধরে যাদের হাত ধরে এই শিশুরা প্রথম অক্ষর জ্ঞান লাভ করেছে, আজ তাদেরই ছেড়ে মাধ্যমিকের পথে পা বাড়াতে হচ্ছে। এ যেন এক অপূর্ণতার বেদনা, আবার নতুন জীবনের উদ্দীপ্ত আহ্বান।
প্রধান শিক্ষক চাঁদ সুলতানা তার বক্তব্যে বলেন, আজ আমাদের স্কুল পরিবারের একটি অংশ বিদায় নিচ্ছে। তোমরা আমাদের গর্ব। পাঁচ বছর ধরে তোমাদের হাসি-কান্না, দুষ্টুমি-আদর সবই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। মাধ্যমিকে গিয়েও যেন তোমরা এই স্কুলের নাম উজ্জ্বল করো, মানুষের মতো মানুষ হয়ে বড় হও, এই প্রত্যাশা রাখি।
সহকারী শিক্ষক মাহমুদুল হক বলেন, আমি যখন তোমাদের প্রথম ক্লাস নিতে এসেছিলাম তখন অনেকেই ঠিকমতো লিখতে পারোনি। আজ তোমরা এত সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করছ, গান গাইছ। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা যখন আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে, তখন বুঝি আমি শুধু শিক্ষক নই, আমি তোমাদের বাবার মতোই হয়ে গেছি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী শিক্ষক আবদুস শুক্কুর, কামরুন নাহার, বিশ্বজিৎ সিংহ, মাহবুবা রহমান, মাহমুদুল হক, ফারজানা চৌধুরী, শেফালী দেবী, পল্লব দাশ, শাহিন আকতার, নিগার সুলতানা, সারোয়ার জাহান, পিংকি সেন, লুৎফর নাহার ও উম্মে তানজিলা।
বিদায়ী শিক্ষকদের প্রত্যেকের চোখেই ছিল গর্ব আর বিচ্ছেদের বেদনার মিশ্র অনুভূতি। বিদায়ের এই দিনটি শেষ হয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে ফুল, ক্রেস্ট ও স্মারক উপহার তুলে দিয়ে। কিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে গেল একটি কথা, ‘যতদিন বেঁচে থাকব, এই স্কুল আর এই শিক্ষকদের ভুলব না’।
বিদ্যালয়টির বিদায়ী শিক্ষার্থী ত্বাহী বলেন, মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, একটি আবেগের নাম। যেখানে শিক্ষার সঙ্গে মিশে আছে ভালোবাসা আর মমতার অশ্রু।
