টাকা নেন গুনগুনে জুয়েল, বুঝিয়ে দেন জগদীশ চাকমা

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সিসিএস দপ্তরে দুর্নীতির হাট-বাজার, নেপথ্যে জুয়েল 

অগণিত ভুয়া ফাইল তৈরির ভয়ংকর তথ্য ফাঁস,খাতার স্টকের গড়মিলের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক:

চট্টগ্রামে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে সরঞ্জাম ক্রয়ের সিসিএস দপ্তর বর্তমানে  লাগামহীন দুর্নীতির হাট বাজারে পরিণত হয়েছে। দেখার যেন কেউ নেই চলছে ওপেন সিক্রেট টাকার খেলা।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক সিসিএস দপ্তরের (জেনারেল) সেকশনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) পদে কর্মরত রয়েছেন আমিনুল ইসলাম জুয়েল। অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তা সরঞ্জাম ক্রয়ের নামে  অগণিত ভুয়া ফাইল তৈরি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আর এই টাকার ভাগ বাটোয়ারা চলে যায় সিসিএস দপ্তরের প্রধান হয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম পর্যন্ত।
সূত্র বলছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি অগণিত ভুয়া ফাইল বানিয়ে সরঞ্জাম ক্রয়ের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। খাতায় উল্লেখ থাকলেও স্টকে নেই। স্টক যাচাই করলে ভয়ঙ্কর গরমিলের প্রকৃতি তথ্যচিত্র মিলবে সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ উঠেছে, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাদের পছন্দে কয়েকজন ঠিকাদার দিয়েও নামে/বেনামে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। দীর্ঘদিন এমন কাণ্ড করতে থাকলেও নিরব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়,নানান অনিয়ম ও দুর্নীতি সরকারি অর্থ দিনশেষে গুনে গুনে নেন আমিনুল ইসলাম জুয়েল। আর এই টাকা বুঝিয়ে দেন ওই দপ্তরের প্রধান সহকারী জগদীশ চাকমা। যার প্রমাণ মিলেছে গত ২০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে।
ঐদিন দুপুরে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে  গিয়ে দেখা যায়, পূর্বধারা প্রতিবেদকের সামনেই
আমিনুল ইসলাম জুয়েল গুনে গুনে ঘুষের টাকা বুঝিয়ে নিচ্ছেন অফিসের প্রধান সহকারী জগদীশ চাকমা থেকে। এই দুর্নীতি যেন ওপেন সিক্রেট। এক সময় প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর আনেকটা হতভম্ব হয়ে পড়ে জুয়েল। কিছুই না জানার ভান করার মত মুঠোফোনে অন্য জনের সাথে এলোমেল কথা বলা শুরু করেন জুয়েল।
এই ঘটনায় জুয়েল বিচলিত হলেও প্রতিবেদককে না চেনায় পুরোদমে স্বাভাবিক ছিলেন জগদীশ চাকমা। এক পর্যায়ে  ওই টাকা টেবিলের উপর পেপার ওয়েট এর সাথে একটি সাদা কাগজ  চাপা দিয়ে রেখে চলে যান জগদীশ চাকমা। পরে মুঠোফোনে জানতে চাইলে জগদীশ চাকমা বলেন, এগুলো অফিসের স্যারদের টাকা। এ কথা বলে ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে জেনারেল সেকশনের আওতায় কম্পিউটার সহ সকল প্রকার ইলেকট্রনিক্স ও আসবাবপত্র ক্রয় করা হয়। কিন্তু এসব সরঞ্জামের  রিক্যুইজিশন ফাইনালের প্রত্যেকটি থেকে  ১০% কমিশন হাতিয়ে নেন আমিনুল ইসলাম জুয়েল। আবার সরঞ্জাম রিসিভের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বড় ধরনের গরমিল। অধিকাংশ কেনাকাটায় সরঞ্জাম ক্রয়ের ভাউচার নিয়েই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সাপলিয়ার্সদের কাছ থেকে গোপনে ২০% থেকে ৩০% কমিয়ে ৭০% থেকে ৭৫% নগদ টাকা লুটে নেন। আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সরঞ্জাম বুঝিয়ে পাওয়ার  কাগজ প্রেরণ করেন। যা তদারকির অভাবে কারো বুঝার সুযোগ থাকে না। তার চেয়েও বড় ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটার নামে ভরি ভুরি  ভুয়া রিক্যুইজিশন  ফাইল তৈরি করে পুরো অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা তার জন্য নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা তার অধীনে গত এক বছরের সরঞ্জাম কেনাকাটার তথ্যগুলো যাচাই করলে থলের  বিড়াল বেরিয়ে আসবে এবং খাতা আর স্টকের ভয়ঙ্কর গরমিলিয়ে তথ্যচিত্র রহস্য ও উন্মোচিত হবে।
ইতিপূর্বে  আমিনুল ইসলাম জুয়েল পাহাড়তলীতে অবস্থিত রেলওয়ে বিভাগীয় ভুসম্পত্তি দপ্তরে এও হিসেবে কর্মরত অবস্থায় নিজের নামে রেলের জায়গা বেচে খাওয়ার সাথে জড়িত থাকার  অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এওজি  আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ভাই কেনাকাটা কি তা বুঝিনা এখানে কোন কেনাকাটা হয়না।  কি ধরনের সরঞ্জাম কেনাকাটার রিকুজিশন দিতে হয় তাও আমি জানিনা। এখানে আমি নতুন এসেছি মাত্র ছয় মাস হয়েছে। আপনি আসার পর থেকে এখানে কোন কিছুই কেনাকাটা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে কম্পিউটার ফার্নিচার কেনাকাটা হয়েছে কিছু তবে আমার হাত দিয়ে কোন কেনাকাটা হয়নি। আর সরঞ্জাম বুঝে নেন জগদীশ বাবু। আমি জাস্ট ফাইল স্বাক্ষর করি মাত্র ।তবে এ বিষয়ে ভালো জানেন সিসএস দপ্তরের এসিওএস শরীফ সাহেব আর সদ্য বদলি হওয়া জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক জেনারেল আসিফ স্যার আপনি চাইলে তাদের সাথে কথা বলতে পারেন।
জগদীশ চাকমা আপনাকে কিসের টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা  আমাদের ইমপ্রেষ্টের টাকা। মানে কলম কেনার টাকা। তাহলে সেখানে গাড়ি ভাড়া দিতে চাইলেন কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি এর উত্তর না দিয়ে  বলেন এখানে অনেক সাংবাদিকরা সাপ্লাইয়ের কাজ করেন। কারা কারা করতেছে জানতে চাইলে তিনি কয়েকজনের নামও উল্লেখ বলেন।
 উল্লেখ্য বিভিন্ন কেনাকাটায় বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অফিসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একযোগে দুইটি এনফোর্সমেন্ট টিম যুগপৎ অভিযান পরিচালনা করেছে চলিত বছরের ২৮ মার্চ।

অভিযানকালে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে টিম। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ের ১৫টি কার্যালয়ের কেনাকাটায় সরকারের ১১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৪২৬ টাকার লুটপাটের অভিযোগ ছিল।

আরও পড়ুন  সাংবাদিক পরিচয়ে ইয়াবা কারবারী, গ্রেফতার ১

অভিযানকালে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে টিম। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ের ১৫টি কার্যালয়ের কেনাকাটায় সরকারের ১১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৪২৬ টাকার লুটপাটের অভিযোগ ছিল।এতে কিছুর সত্বেও রেলওয়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে কোনভাবে দুর্নীতি থামানো যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলের রেলের  সিসিএস দপ্তরের এসিওএস শরিফ উদ্দিন বলেন সিসিএস দপ্তরে কেনাকাটায় ৫-৬ জন লোক আছে। এখানে যার কাজ সে করে। তার সিনিয়র বস আছে তিনি কেন আমার কথা বলছেন তা আমি জানিনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী আসিফুল ইসলাম মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও কোন সাড়া শব্দ মিলেনি।
রেলের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস)  বেলাল উদ্দিনের কাছে  অভিযোগের বিষয়টি জানতে বহুবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ না করে ফোন কল কেটে দেন । সারেজমিনে অফিসে গিয়েও তার দেখা মিলেনি।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মচারী বলেন, স্যার বর্তমানে ঢাকায় রেল ভবনে বসেন, মন চাইলে তিনি সপ্তাহে একদিন অথবা দুই দিন  আসেন নইলে আসেন না।  বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন।
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন