কালিরছড়া খাল খননে প্রাণ পাচ্ছে চট্টগ্রাম

জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বিস্তীর্ণ এলাকার #চাষাবাদ হবে শত হেক্টর ফসলি জমিতে #জীবিকায় ফিরছেন হাজারো জেলে পরিবার #দূর হবে পানির সংকট

বিশেষ প্রতিবেদন: 

কালিরছড়া খাল খননে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, হালিশহর, পাহাড়তলি ও পতেঙ্গাসহ চট্টগ্রাম মহানগরীর অধিকাংশ এলাকা। জলাবদ্ধতা থেকে মিলছে মুক্তি। চাষাবাদ হবে পতেঙ্গা ও পাহাড়তলির বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। মাছ ধরার জীবিকায় ফিরছেন খালের দু‘পাড়ের জেলেপাড়ার হাজারো জেলে। দূর হবে মিঠা পানির সংকটও।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে এ তথ্য জানান স্থানীয় জেলে ও কৃষকরা। তাদের মতে, কালিরছড়া খাল খনন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চাষাবাদ হচ্ছে না পতেঙ্গা এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। ফলে নিজেদের জমি বিক্রী করা শুরু করেন কৃষকরা। ক্রেতারা গড়ে তোলা শুরু করেন বসতি ও বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে মাছ শুন্য হওয়ায় খালের দু‘পাড়ের জেলেপাড়ার হাজারো জেলে পরিবার দীর্ঘ সময় বেকারত্বের করালগ্রাসে অভাব-অনটনে দিন পার করছেন। আর সেই কালিরছড়া খাল খননে এখন জীবিকায় ফিরছেন হতদরিদ্র জেলে পরিবারের সদস্যরা।

স্থানীয়রা জানান, কালিছড়া খাল খনন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে আকুল আবেদন জানিয়ে আসছিলেন তারা। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের স্থানীয় এমপিসহ কেউ সেই আবেদন গ্রাহ্য করেনি। অবশেষে অন্তবর্তি সরকারের মাননীয় পানি সম্পদ উপদেষ্টা মহোদয় কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেন।

যা তত্ত্বাবধান করছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১। এতে চাষাবাদ ও মাছ ধরার পেশা হারানো জেলে পরিবার এবং কৃষকরা পুনরায় প্রাণস্পন্দন ফিরে পায়। স্থানীয়রা ফিরে পান প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস।

কাট্টলী বিলের কৃষক আজাদ হোসেন জানান, কালিরছড়া খালের পাড়ে তার এক একর কৃষি জমি রয়েছে। যেখানে ২৫-২৬ বছর আগে দুই মৌসুমে ধানচাষ ও এক মৌসুমে সবজি খেতের চাষ হত। যা দিয়ে স্বাচ্ছন্দে চলত তাদের সংসার। কিন্তু খালটি ক্রমেই ভরাট হয়ে মরা খালে পরিণত হয়। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় চাষাবাদ।

এতে দারিদ্রতার খড়গ নেমে আসে তাদের পরিবারে। খাল খননে পানি সংকট দূর হওয়ায় এবার নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান তিনি। একই কথা বলেছেন কাট্টলী বিলের কৃষক আমজাদ হোসেন, ফরিদ উদ্দিন, আকরাম মাঝি ও বাদল রায়হানসহ অনেকেই।

আরও পড়ুন  বান্দরবানের চুলার আগুনে বসতঘর পুড়ে ছাই

কাট্টলী জেলেপাড়ার জেলে জগদীশ চন্দ্র জলদাশ জানান, কালিরছড়া খালের পাড়ে জেলেপাড়ায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবার রয়েছে। যারা এক সময় এই কালিরছড়া খালে মাছ ধরার উপর জীবিকা নির্বাহ করতেন। এই খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে সাগরে মাছ ধরার ট্রলারে যেতেন। সাগর থেকে মাছ ধরে আবার সহজে এই খাল দিয়ে ফিরে আসতেন। কিন্তু খালটি ভরাট হওয়ার পর মরা খালে পরিণত হয়। সেই থেকে মাছ ধরার পেশা হারাতে শুরু করে জেলেরা। এতে দরিদ্রতার অভিশাপ নেমে আসে জেলে পরিবারগুলোতে।

তাদের ভাষ্য, শুধু চাষাবাদ ও মাছ ধরা বন্ধ নয়-প্রতিবছর বর্ষাকালে এই খাল দিয়ে পাহাড়ি ঢল নেমে পুরো পতেঙ্গা এলাকা ডুবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হত। এতে ঘরবাড়ি-গৃহপালিত পশু হারিয়ে দিন দিন দারিদ্র্যতার শিকার হন এলাকার মানুষ। সেই কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কার করায় পানি সম্পদ উপদেষ্টা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, কালিরছড়া খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছর বর্ষাকালে শুধু পতেঙ্গা নয়, হালিশহর, পাহাড়তলি, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হত। এই খাল খনন ও সংস্কারে আশা করি সেই জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন হবে। সেই সাথে পতেঙ্গা কাট্টলী এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে চাষাবাদ হবে। মাছ ধরার পেশায় ফিরবেন হাজারো জেলে পরিবার।

তিনি জানান, পতেঙ্গা কাট্টলী এলাকার হাজারো মানুষের আকুতি শুনে এই কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এসব মানুষের আকুতি নজর কাড়ে অন্তবর্তি সরকারের মাননীয় উপদেষ্টারও। বলতে গেলে কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কার মাননীয় উপদেষ্টার উদ্যোগ। যা বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

মো. ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স (প্রা:) লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কার প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় কালিরছড়া খালের সুইচগেট থেকে বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এবং লেকসিটি আবাসিকের আধা কিলোমিটার খনন ও সংস্কার কাজ চলছে। এতে চাষাবাদ ও মৎস্যকুলের পাশাপাশি মানুষের পানির উৎসকেন্দ্রে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন  হাড়িভাসা সীমান্তে ২৩ জনকে পুশ-ইন করেছে (বিএসএফ)

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এই কালিরছড়া খাল খনন ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কারণ এই খাল বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী এমপি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিনের অবৈধ দখলে ছিল। প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও অনুসারিদের শত বাধা ডিঙ্গিয়ে এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন