logo
এলপিজি নিয়ে তামাশা
সংবাদ প্রকাশিত:

লিকুইফাইড পেট্রোলিয়ম গ্যাস বা লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) মূলত দাহ্য হাইড্রোকার্বন গ্যাসের মিশ্রণ এবং জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে, গাড়ি ও ভবনের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বাসাবাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। বাজারে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রয়েছে ৩০টি কোম্পানির অন্তত দুই কোটি সিলিন্ডার। আবার এই ক্লিন বা গ্রিন ফুয়েল জনগণের কাছে বেশ সমাদৃত।  প্রথম দিকে এই সিলিন্ডার ব্যবহারে মানুষ তেমন আগ্রহী ছিল না। কিন্তু জ্বালানি গ্যাসের মোট চাহিদা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায়, বাধ্য হয়ে মানুষ হাত বাড়ায় এই গ্যাসের ওপর। আবার অনেক জায়গায়, বিশেষ করে নতুন বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংযোগ না দেওয়াতে বাধ্য হয়েই ব্যবহার করতে হচ্ছে সিলিন্ডার। এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়াতে মানুষের ত্রাহি অবস্থা, এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শুধু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করেই যাচ্ছে। কিন্তু বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে কি না তা কে বলবে? তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ? অনেকেই বলছেন বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে, সিলিন্ডারের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়াতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এই সুযোগে সরকারি-বেসরকারি সিলিন্ডার কোম্পানিগুলো ইচ্ছামাফিক মূল্যবৃদ্ধি করে যাচ্ছে।

ট্টগ্রাম সহ সমগ্র বাংলাদেশের হাট-বাজারে কোথাও মিলছে না এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডার নেই বললেই চলে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। এই নিয়ে চলছে তামাশা।

ভোক্তারা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট চলছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে চট্টগ্রাম শহরে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার।

শহরতলীর কিছু খুচরা দোকানে মজুদ থাকা কয়েকটি সিলিন্ডার মিললেও দাম হাঁকা হচ্ছে দুই হাজার টাকারও বেশি। অথচ ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ২৫৩ টাকা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কৃত্রিম সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন আমদানি কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের সংকট স্মরণকালের ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্যারেড ময়দানে তাফসীরুল কোরআন মাহফিল ২৭ জানুয়ারি থেকে

এই সুযোগে তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বৃহ¯পতিবার সকাল থেকে বাংলাদেশের সকল এলপি গ্যাস বিপণন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এছাড়া সকল ক¤পানি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

তাদের দাবিগুলো হলো-বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে নতুন করে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য সমন্বয় করতে হবে। কমিশন বাড়াতে হবে। প্রশাসন দিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধ করতে হবে।

ব্যবসায়ী সমিতির মতে. এলপি গ্যাস সংকট ঘুচিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এলপি গ্যাস অপারেটরস অব বাংলাদেশকে (লোয়াব) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু এই চিঠির কোন প্রভাবই বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লোয়াবের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক জানান, দেশের শীর্ষ কয়েকটি ক¤পানি এলপি গ্যাস আমদানি করতে না পারায় ডিসেম্বরে আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। নতুন করে কিছু ক¤পানি বটলিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির আবেদন করলেও সরকার অনুমোদন দিচ্ছে না। এতে করে সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের বড় ক¤পানিগুলোর কোটার এলপি গ্যাস আমরা আমদানি করতে চেয়েছিলাম। আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখেছি। কিন্তু আমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়নি। আমাদের অনুমতি দেয়া হলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। তবে সমস্যাটি ১০-১৫ দিনের মধ্যে কেটে যাবে বলে জানিয়েছেন লোয়াবের প্রেসিডেন্ট।

লোয়াবের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, ইউনিটেঙের মতো বড় ক¤পানিগুলো এলপি গ্যাস আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় পরিবেশকরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার সংকট তীব্র হয়েছে। ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা।

চাহিদা ও যোগানের ব্যাপক পার্থক্যের কারণেই বাজারে এলপি গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করে লোয়াবের একাধিক সদস্য বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বেশ কিছু জাহাজ এলপি গ্যাস পরিবহন করতে পারছে না। এতে করে গত ডিসেম্বরে এলপি গ্যাসের আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তাই সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন  কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর জমজমাট লড়াই হবে

ব্যবসায়ীরা জানান, এলপি গ্যাস ইচ্ছে করলেই আমদানি করা যায় না। সরকারের অনুমোদন পেতে হয়। সরকার আগে অনুমোদন দেয়নি। এখন দিয়েছে। অপরদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের সাথে বড় বড় ক¤পানিগুলোর ঝামেলা রয়েছে। তারা এলসি খুলতে পারছে না। ব্যাংক ফিন্যান্স না করলে এলপি গ্যাস আমদানি সম্ভব নয় বলেও তারা উল্লেখ করেন।

খুচরা ও পাইকারি এলপি গ্যাস বিক্রেতারা বলেন, ক¤পানিগুলো থেকে চাহিদার তুলনায় গ্যাস পাচ্ছেন খুব সামান্য। কোনো কোনো পরিবেশক সিলিন্ডারই পাচ্ছেন না। ফলে দোকান বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। শহরতলীর কিছু খুচরা দোকানে মজুদ থাকা অল্প কিছু এলপি গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে। ক্রেতারা সেখান থেকে যে যেভাবে পারছে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কিনে নিচ্ছে। সুযোগ বুঝে বিক্রেতারাও বেশি দাম আদায় করছে।

বিক্রেতাদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে মিলছে ১০০-১৫০ এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। এতে চাহিদা মিটবে কি করে? এলপি গ্যাস সংকটের এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে মোটা অংকের ব্যবসা করছেন কিছু বিক্রেতা।

তারা সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে দোকান থেকে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার সরিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এই চক্রটি এলপি গ্যাস সংকটকে মহাসংকটে পরিণত করেছে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছেন।

নগরবাসীর মতে, দেশের বাসা বাড়িতে গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ থাকার প্রেক্ষিতে শহরের হাজার হাজার বাসা বাড়িতে এলপি গ্যাস ব্যবহৃত হয়। শত শত বহুতল ভবনে এলপি গ্যাসই একমাত্র ভরসা। ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করেই হাজার হাজার বাসা বাড়িতে রান্নাবান্না চলে।

এলপি গ্যাসের অভাবে এখন এসব বাসার বাসিন্দাদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, বহু হোটেল রেঁস্তোরাও এলপি গ্যাস দিয়ে রান্না করে। ঘরে এবং হোটেলে রান্না বন্ধ থাকলে মানুষ বাঁচবে কি করে বলেও তারা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।

চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের অসংখ্য দোকানে গিয়েও একটি সিলিন্ডার পাইনি। কোন দোকানেই এলপি গ্যাস সিলিন্ডার নেই। টাকা দিয়েও মিলছে না এলপি গ্যাস। এতে পরিস্থিতি চরমভাবে নাজুক হয়ে গেছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নগরজীবন বিষিয়ে উঠবে। এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে খুচরা ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের জিম্মি করে টাকা হাতানোর মিশনে নেমেছে বলেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।চকবাজার খলিফাপট্টি এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, গত সপ্তাহে পুরো চট্টগ্রাম শহরের কত দোকানে যে গেছি তার ঠিক নেই, কিন্তু একটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারও পাইনি। শেষে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে দুই হাজার টাকায় একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছি।

আরও পড়ুন  চেয়ারম্যান-মেয়র হতে লাগবে স্নাতক ডিগ্রি

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, এলপি গ্যাস আমদানিকারকেরা বিইআরসি-নির্ধারিত দামে ডিলারদের সরবরাহ করছে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটকে পুঁজি করে কিছু করলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।

দিনভর ভোগান্তির পর ধর্মঘট প্রত্যাহার
সারাদেশে বিক্রি বন্ধ করে বৃহ¯পতিবার সারাদিন জনসাধারণকে ভোগান্তির মধ্যে রেখে শেষমেশ ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলাটেরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে বিইআরসি কার্যালয়ে হওয়া বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা।

গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, এলপি গ্যাসের দোকানে ভোক্তা অধিকারের অভিযান বন্ধ করলেই ধর্মঘট প্রত্যাহার হবে। আর ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৫০০ টাকা নির্ধারণেরও দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে গ্যাস ব্যবসায়ীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে করছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী দাম বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। পরে তার আহ্বানে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন ব্যবসায়ীরা।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, যারা ইন অ্যাকটিভ ক¤পানি আছে তাদের আগামী সপ্তাহে আলোচনায় ডাকা হবে। চলমান সংকট সমাধানে বিইআরসি চেষ্টা করে যাবে। এ সময় গ্যাসের চলমান সংকট আসন্ন রমজানের আগেই কেটে যাবে বলে আশ্বন্ত করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।