ঈদ উৎসবের হারানো ঐতিহ্য ও শেকড়ের টান

নুরুল মুহাম্মদ কাদের লেখক প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

শেয়ার করুন
বাংলাদেশে ঈদ উল ফিতর কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি সামাজিক বন্ধন, মানবিকতা ও শৈশবের স্মৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। এক মাসের রোজা, সংযম ও আত্মশুদ্ধির পর যে আনন্দ আসে, তা ছিল এক ধরনের সার্বজনীন মিলনমেলা। জাতি, বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ একসাথে আনন্দ ভাগ করে নিত। পুরনো দিনের সেই ঈদ ছিল কোলাহলের মধ্যে মমত্ববোধের উষ্ণতা, আত্মীয়তার ঘ্রাণ আর শিশুর মুখে অমলিন হাসির উৎসব। আজ সেই রূপ অনেকটাই বদলে গেছে; আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐতিহ্য ক্ষয়প্রাপ্ত, তবু স্মৃতির শেকড় এখনও হৃদয়ে গভীরভাবে জেগে থাকে।
পুরনো দিনের ঈদের চিত্র ; গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ঈদের আগেই যেন এক আলোকিত কোলাহলে ভরে উঠত। সকালে নামাজ শেষে কোলাকুলি, আলিঙ্গন ও শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল দিনের প্রথম দৃশ্য। শিশুদের হাসি ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত।নতুন জামা, নতুন জুতো, হাতে মিষ্টি আর চোখে অদম্য উচ্ছ্বাস। বাড়ি বাড়ি ঘুরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, ঠাট্টা এসব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠত এক অনবদ্য মিলনমেলা। মায়ের হাতের পায়েস, সেমাইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ, দুপুরের পোলাও, মাছ-মাংসের আয়োজন, এসবই ছিল ঈদের স্বাদ। হাট-বাজারে কেনাকাটা, নতুন কাপড়ের পছন্দ, প্রতিবেশীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় সবকিছুতে ছিল এক ধরনের সামাজিক আন্তরিকতা। বিকেলে টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠান, হুমায়ূন আহমেদের নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠানসহ জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলো পরিবারকে একত্রে বসিয়ে রাখত; রাতে অনুরোধের গান, গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় দিনটি শেষ হতো। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় পুরো পরিবার একসাথে সময় কাটাত; মা-বোনের সঙ্গে খুনসুটি, রাত জাগা, মান-অভিমান এসবই ছিল ঈদের অঙ্গ।
আবার সেকালে ঈদ ছিল ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত, ছোটদের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ পেত, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া হতো এসব মিলিয়ে ঈদ ছিল সামাজিক বন্ধনের এক শক্তিশালী বন্ধন।
আধুনিকতার ছোঁয়া ও পরিবর্তন : বর্তমান সময়ে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, চাকরি-শিক্ষার চাপ, দূরত্ব এসব কারণে এবাড়ি-সেবাড়িতে বেড়ানোর সুযোগ কমে গেছে। প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল বিনোদন মানুষের সময় ও মন দখল করে নিয়েছে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিড়ে বাস্তব মিলনমেলার গুরুত্ব কমে এসেছে। অনেকেই ঈদকে এখন একটি ফটোগ্রাফিক মুহূর্ত বা সামাজিক প্রোফাইল আপডেট হিসেবে গ্রহণ করে; গভীর অনুভূতি, ত্যাগ বা মমত্ববোধের জায়গা দখল করেছে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। এছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিবাদ এসবও ঈদের আনন্দকে ক্ষুণ্ন করে। অনেক ক্ষেত্রে শুভেচ্ছা বিনিময় থাকলেও তা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়; ত্যাগের মহিমা, আন্তরিকতার উষ্ণতা আর সহমর্মিতা অনুপস্থিত থাকে। ফলে ঈদ হয়ে ওঠে শূন্যতা ও অভাবের প্রতিচ্ছবি, আনন্দহীন, অনুভূতিহীন এবং একরকম রুটিনের অংশ।
তবে অনেক জনপদে ঈদের উৎসব সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়নি। অনেক পরিবার এখনও ঐতিহ্য রক্ষা করে, গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, শিশুদের মধ্যে উৎসবের আনন্দ জাগ্রত করে। পারিবারিক পুনর্মিলন, প্রতিবেশীর খোঁজখবর, দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো এসব কাজ আজও ঈদের প্রকৃত অর্থকে টিকিয়ে রাখে।
শেকড়ের টান ও ব্যক্তিগত স্মৃতি ; শৈশব-কৈশোরের গ্রামীণ ঈদের স্মৃতি ব্যক্তিগত জীবনের গভীরে অম্লানভাবে রয়ে যায়। শৈশবের ঈদ ছিল এক ধরনের নির্জন প্রশান্তি। যেখানে প্রযুক্তির কোলাহল ছিল না, যেখানে মানুষের মুখে সরলতা ও আন্তরিকতা ছিল। সেই স্মৃতি আজকের জীবনের তাড়াহুড়োতে একটি নীরব প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে; মনে করিয়ে দেয় যে উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক আয়োজন নয়, বরং অন্তরের শান্তি, সম্পর্কের গভীরতা ও সহমর্মিতা। চাকরির কারণে শহরে বসবাস করলেও গ্রামবাংলার সহজ-সরল রূপ, নদীর মতো শান্ত শৈশব, সেই নতুন চাঁদের আলো এসব স্মৃতি হৃদয়ে বারবার ফিরে আসে। বাব-মায়ের মৃত্যুর পর গ্রামে যাওয়া কমে গেলেও শেকড়ের টান মুছে যায়নি; ঈদের দিনে সেই টান অনুভব হয়।
পুনরুজ্জীবনের আহ্বান :  ঈদকে কেবল একটি সামাজিক রুটিন বা ভোগ্যপণ্য হিসেবে গ্রহণ না করে, আমরা যদি তার মূল মানবিক মূল্যকে পুনরায় উপলব্ধি করি। তবে ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। কিছু সহজ প্রয়াসই যথেষ্ট: পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা ও শেয়ারিংয়ের শিক্ষা দেওয়া, এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমা আরোপ করা। এসব ছোট ছোট কাজই ঈদের আসল রূপকে ফিরিয়ে আনতে পারে। শহর-গ্রামের দূরত্ব যতই বাড়ুক, শেকড়ের টান যদি হৃদয়ে অটল থাকে, তবে ঈদ তার মানবিকতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ঈদকে কেবল উৎসব নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন হিসেবে গ্রহণ করা।
ঈদ উল ফিতর আমাদের সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায়; এটি ধর্মীয় অনুশাসন ছাড়াও মানবিকতা, মমত্ববোধ ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও শেকড়ের টান, শৈশবের স্মৃতি ও পারিবারিক বন্ধন যদি আমরা সচেতনভাবে রক্ষা করি, তবে ঈদ আবারও সেই গভীর আনন্দ ও সৌহার্দ্যের উৎসবে পরিণত হবে। ঈদ আসুক প্রতিটি মানুষের জীবনে অনাবিল আনন্দ, হাসি এবং সমাজে সংযম, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে।
আরও পড়ুন  বাংলাদেশ সাংবাদিক ক্লাব কেন্দ্রীয় কমিটির ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন