মহেশখালীর সোনাদিয়ায় ফের প্যারাবন নিধন—

চিংড়ি ঘেরের আড়ালে উপকূলীয় পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ

নূর মোহাম্মদ, সহ-বার্তা সম্পাদক

শেয়ার করুন

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে আবারও উপকূলীয় প্যারাবন (ম্যাংগ্রোভ বন) নিধনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শত শত একর প্যারাবন উজাড় করে সেখানে চিংড়ি ঘের নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। উপকূলীয় এই প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংসের ঘটনায় পরিবেশ সচেতন মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনাদিয়া দ্বীপের মাদ্দারখাল এলাকায় নতুন করে প্রায় ৫০০ একর প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে অন্তত পাঁচটি স্কেভেটর ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, সোনাদিয়া পূর্ব পাড়ার মুহাম্মদ হোসেন, কুতুবজোমের নয়াপাড়ার জাহাঙ্গীর, ঘটিভাঙ্গার রিমন মেম্বার এবং বড় মহেশখালীর ফকিরা ঘোনার সোহাগসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।এলাকাবাসী জানান, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে প্যারাবন কাটা অনেকটাই বন্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সেই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, কারা এত শক্তিশালী যে প্রকাশ্যে বন উজাড়ের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে, আর কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই পরিবেশ ধ্বংসের মহাযজ্ঞ চলছে।স্থানীয়দের দাবি, এলাকার সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদ কিছুদিন আগে জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন—তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অবৈধভাবে একটি বাইন গাছও কাটতে দেওয়া হবে না। কিন্তু বর্তমানে শত শত একর প্যারাবন কেটে ফেলার অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক অভিযান বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় প্যারাবন শুধু একটি বনভূমি নয়, বরং এটি উপকূলের মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। এই পরিস্থিতিতে প্যারাবন ঝড়ের গতি কমিয়ে উপকূলীয় জনপদকে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করে, বিভিন্ন মাছ, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।সোনাদিয়া দ্বীপ জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে নানা প্রজাতির পাখি, মাছ, কাঁকড়া এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর আবাস রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের নির্মাণ করা হলে এই পুরো বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত চিংড়ি ঘের তৈরির কারণে ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে, লবণাক্ততা বেড়েছে এবং জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে।এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ প্যারাবন নিধনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মহেশখালীর উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, উপকূল রক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।তাদের ভাষায়, উপকূলীয় প্যারাবন শুধু একটি বন নয়—এটি উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই উন্নয়নের নামে এই প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস না করে বরং তা সংরক্ষণ করাই এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ১
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন