চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত সাতটি জেলায় প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ হাম উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোর জেলায় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ঘাটতি, রোগ নজরদারির দুর্বলতা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব—এই তিনটি কারণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়মতো এমআর (Measles-Rubella) টিকা না দেওয়ায় শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত হওয়াও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে।
রোববার অনুষ্ঠিত এক সংসদীয় বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, পরিস্থিতি ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে এসেছে এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দুই মন্ত্রীকে সারাদেশ সফরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাম সাধারণত শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। রোগের শুরুতে উচ্চমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং পরে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা শিশুর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি করণীয় হলো শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করা। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে এমআর টিকা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। পাশাপাশি শিশুকে পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ সরবরাহ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, ঘরে ঘরে টিকা পৌঁছে দেওয়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং টিকা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা চালানো এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে, হাম সংক্রমণের এই বিস্তার একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেও অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
