প্রতি বছর ২ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০২৬। যা অটিজম বা অটিস্টিক স্পেকট্রাম বিকাশজনিত সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজে সহানুভূতিশীল মনোভাব তৈরির উদ্দেশ্যে উদযাপিত হয়। এই দিনটি মূলত অটিজমকে বোঝা, প্রারম্ভিক সনাক্তকরণ এবং সহায়তা প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরে।
অটিজম একটি জটিল স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা, যা শিশুর সামাজিক, ভাষাগত এবং আচরণগত বিকাশকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা শিশুদের জন্য অটিজম সনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং সমর্থনের উপর গুরুত্বারোপ করে। সচেতনতা বৃদ্ধি করা মানে শিশুর বিকাশকে সহায়তা করা এবং পরিবার ও সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব তৈরি করা।
অটিজম কী এবং এর প্রকৃতি
অটিজম হল এমন একটি মানসিক এবং আচরণগত ভিন্নতা, যার ফলে একজন শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা ব্যবহার, চিন্তাভাবনা এবং আচরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন হয়। অটিজম থাকা মানে শিশুটি কম বুদ্ধিমান নয়; বরং তাদের চিন্তাভাবনা ও আচরণ ভিন্ন মাত্রার। এটি সাধারণত জীবনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে লক্ষ করা যায়।
অটিজমের ধরন ও প্রভাব শিশুর
বয়স, জেনেটিক প্রোফাইল এবং পরিবেশগত উপাদানের উপর নির্ভর করে।
অটিজমের কারণ
* জেনেটিক প্রভাব: পরিবারে অটিজমের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। বিশেষ কিছু জিনের পরিবর্তন মস্তিষ্কের স্নায়ুবিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে।
* মাতৃ ও প্রসবকালীন স্বাস্থ্য: গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, পুষ্টির অভাব, ধূমপান বা মদ্যপান শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
* পরিবেশগত উপাদান: বিষাক্ত পদার্থ, ভারী ধাতু বা দূষিত পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে।
* মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তন: অটিজমে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ ও তথ্য প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতা থাকে, যা আচরণগত ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কারণগুলো একত্রিত হয়ে অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পরিসংখ্যান
অটিজম উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেরও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা।আর সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও ইদানীং অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে এদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী প্রতি দশ হাজারে একজন ছিল। ২০০৯ সালে ১৫০ জনে একজন এবং এরপর প্রতি এক’শ জনে একজন অটিস্টিক ছিল। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, গ্রামের তুলনায় শহরে অটিস্টিক শিশু জন্মের হার বেশি। গ্রামে প্রতি ১০ হাজারে ১৪ জন এবং শহর এলাকায় প্রতি ১০ হাজারে ২৫ শিশু অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। মেয়ে শিশুর চাইতে ছেলে শিশুর মধ্যে অটিজমে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এছাড়াও দেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে অটিজম বিস্তারের হার প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন। গ্রামের চেয়ে শহরে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।
বর্তমানে মোট ১৬ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৮ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে যাদের মধ্যে ৪৭ হাজার ৪১৭ জন রয়েছে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি। বর্তমানে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ৭৮ হাজার ২১১ জন। তাদের মধ্যে ছেলে ৪৭ হাজার ৯১৪ জন, মেয়ে ৩০ হাজার ২৪১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৫৩ জন। তবে ধারণানুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখের মতো অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছে। প্রতি বছর তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিশু।যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ অটিজম আক্রান্ত।
অটিজমের লক্ষণ
সামাজিক ও যোগাযোগ সমস্যা
* অন্যদের সঙ্গে চোখে চোখে যোগাযোগ করতে সমস্যা।
* বন্ধু বা সহপাঠীর সঙ্গে মিশতে আগ্রহ কম।
* আবেগ বোঝা এবং প্রকাশে অসুবিধা।
* কথোপকথনে অংশগ্রহণ কম বা ভাষা ব্যবহার সীমিত।
আচরণগত সমস্যা
* একই কাজ বারবার করা বা একঘেয়ে অভ্যাস।
* বিশেষ কোনো বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ।
* নতুন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক বা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
* অস্বাভাবিক শারীরিক আন্দোলন, যেমন হাত নাড়া বা দুলানো।
স্নায়ুবিক ও সংবেদনশীল সমস্যা
* শব্দ, আলো বা স্পর্শের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা।
* হালকা বা তীব্র ব্যথা বোঝার অসুবিধা।
* অনিয়মিত ঘুম বা খাওয়া।
অটিজমের প্রকারভেদ
* প্রথাগত অটিজম: সামাজিক ও ভাষাগত সমস্যায় প্রধান।
* অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম: ভাষা সাধারণত স্বাভাবিক, সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা।
* পেরভেসিভ বিকাশজনিত সমস্যা (হালকা অটিজম): কিছু আচরণগত লক্ষণ থাকে, পূর্ণাঙ্গ অটিজমের মতো নয়।
* শৈশবকালে আচরণগত ক্ষয় (CDD): স্বাভাবিক বিকাশের পরে আচরণ ও ভাষাগত দক্ষতা হঠাৎ হারাতে পারে।
অটিজমের জটিলতা
* শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ: সাধারণ শিক্ষাপদ্ধতিতে মানিয়ে নিতে সমস্যা।
* দৈনন্দিন আত্মনির্ভরতা: খাবার খাওয়া, পোশাক পরা ও দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করা কঠিন।
* মানসিক স্বাস্থ্য: হতাশা, উদ্বেগ ও আচরণজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়।
* সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: বন্ধুত্ব ও সামাজিক সংযোগ বজায় রাখতে সমস্যা।
প্রারম্ভিক সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা
চিকিৎসার লক্ষ্য
সামাজিক ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন, আচরণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবার ও শিক্ষকের সহযোগিতা।
থেরাপির ধরন
* আচরণ থেরাপি
* ভাষা ও বক্তব্য থেরাপি
* সামাজিক দক্ষতা শিক্ষা
* প্রয়োজনে ঔষধ ব্যবহার
অটিজম সমস্যায় হোমিও সমাধান :- হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অটিজম একেবারে তুচ্ছ—হোমিওপ্যাথি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, রোগ এবং রোগের কারণ থাকে মানুষের স্তরে, যাকে জীবনীশক্তি বলা হয়। পক্ষান্তরে শরীরে এবং মনে আমরা রোগ নামে যা দেখি, এগুলো আসলে রোগ নয়, বরং রোগের ফলাফল মাত্র।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, যেহেতু রোগ নয়, রোগীকেই চিকিৎসা করা হয়—এই জন্য মানুষের শক্তির স্তরে কাজ করে এমন ওষুধই হতে হবে শক্তিধর্মী ওষুধ। তাই কোনো শিশু অটিজমে আক্রান্ত মনে হলে অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা হোমিওপ্যাথি নিবন্ধিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় অটিজম নির্ণয় করতে পারলে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অটিজমের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়াগুলো অনেক সফলভাবে মোকাবেলা করা যায়।
শিশুর কী ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করে, অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি নিবন্ধিত চিকিৎসক রোগীর বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করে নির্দিষ্ট হোমিওপ্যাথিক মায়াজম নির্ধারণ করে শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ বিশ্লেষণ করে সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথি ওষুধ প্রয়োগে চিকিৎসা করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
এই ধরনের শিশুদের জন্য প্রচুর বিশেষায়িত স্কুল আছে, যেখানে তাদের বিশেষভাবে পাঠদান করা হয়। এ ধরনের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন কর্মথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি পরামর্শ দেবেন, কোন ধরনের স্কুল আপনার শিশুর জন্য উপযুক্ত হবে।
অনেক অটিস্টিক শিশুর কিছু মানসিক সমস্যা যেমন—অতিরিক্ত চঞ্চলতা, অতিরিক্ত ভীতি, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের সমস্যা ইত্যাদি থাকতে পারে। অনেক সময় এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক শিশুটিকে ওষুধ দিতে পারেন। এ বিষয়ে অসংখ্য লক্ষণভিত্তিক হোমিওপ্যাথি ওষুধ রয়েছে।
নিবিড় ব্যবহারিক পরিচর্যা, স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনে সঠিক ওষুধের ব্যবহার—একটি শিশুর অটিজম সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকখানি সহায়ক হয়। যথাযথ সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে যেসব ওষুধ নির্বাচন করে থাকেন: লাইকোপোডিয়াম ক্লাভাটাম, ক্যালিয়াম মিউরিয়াটিকাম, ন্যাট্রাম মিউরিয়াটিকাম, ল্যাকেসিস, সেপিয়া, আগারিকাস মুসকারিয়াস, এপিস মেল, গ্লোনোয়িনাম, বেলাডোনা, সালফার, কার্সিনোসিন, বিউফো রানা, ক্যালকেরিয়া ফসফোরিকা, কফিয়া টোস্টা, হাইওসায়ামাস নাইজার, কালি ব্রোমাটাম, কালি ফসফোরিকাম, মারকিউরিয়াস সল, ফসফরাস, সাইলিসিয়া, স্ট্রামোনিয়াম, ভেরাট্রাম অ্যালবাম, থুজা অক্সিডেন্টালিস, সিফিলিনাম, নাক্স ভোমিকা—সহ আরও অনেক ওষুধ লক্ষণের ওপর নির্ভর করে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই নিজে নিজে ওষুধ ব্যবহার না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পরিশেষে বলতে চাই,অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অটিজম হল একটি স্বাভাবিক ভিন্নতা। তাই আসুন আমরা সবাই অটিজম সম্পর্কে সচেতন হই। বিশেষকরে গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রতি যত্নবান হই। যেসব সমস্যার কারণে শিশুর অটিজমসহ অন্যান্য রোগের সৃষ্টি হতে পারে, সেইসব কারণ সম্পর্কে সচেতন হই। সেইসাথে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সমবেদনা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করি। তাদের সুস্থ করে তোলার মাধ্যমে দেশের সম্পদে পরিনত করি। যাতে তারাও সুস্থ হয়ে তাদের উপযোগী বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারে। তাহলেই একজন অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তি এই সুন্দর পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার উপলক্ষ্য পাবে।
