logo
চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারগুলো ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ছিনতাই-অপহরণের অভয়ারণ্য
সংবাদ প্রকাশিত:

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বর্তমানে যান চলাচলের জন্য

প্রধান ৪-৫টি বড় ফ্লাইওভার/ওভারপাস চালু রয়েছে।যা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নির্মাণ করেছে। এগুলো হলো—মুরাদপুর আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, বহদ্দারহাট এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, কদমতলী ফ্লাইওভার এবং দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার,
বায়েজিদ-কুয়াইশ ফ্লাইওভার। এছাড়া ১৬.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পতেঙ্গা-লালখান বাজার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও চালু রয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে এসব ফ্লাইওভারগুলো ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও খুব একটা দৃশ্যমান দেখা যায় না।নগরীতে ঘন্টার পর ঘন্টা লেগে থাকে যানজট।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, এই ফ্লাইওভারগুলো ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় কার্যত এগুলো অরক্ষিত। অপরাধী, ছিনতাইকারীদের ভয়ে রাতে ফ্লাইওভারগুলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যবহারকারী প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিক্সা, মোটরসাইকেল আরোহীরা যখন-তখন বিপদে পড়ছেন। সেই সঙ্গে মাদকসেবীদের দখলেও ফ্লাইওভার। যেভাবে ফুটওভার ব্রিজগুলো আগে থেকে দখল করে নিয়েছে মাদকাসক্ত ও বখাটেরা। ফ্লাইওভারের নিচে ভোরবেলায়ও চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। আর সন্ধ্যার পর শুরু হয় ছিনতাইকারীদের সন্ত্রাস। ফ্লাইওভারের ওপর তারা গাড়ি পার্ক করে সাধারণ মানুষের মতো আড্ডা দেয়। ছিনতাইয়ের জন্য অপেক্ষা করে। এক কথায় চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারগুলো ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ছিনতাই-অপহরণের অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে। ফ্লাইওভারের কাছাকাছি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

ছিনতাই আর অপহরণকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে নগরীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বিশেষ করে বিদেশ ফেরত যাত্রীরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার
এলিভেটেড এক্সেপ্রেসওয়েতে কয়দিন বিরতির পর পর ঘটছে ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনা।অপরাধীরা নিরাপদ জোন হিসাবে নগরীর দীর্ঘ এ এক্সপ্রেসওয়ে বেছে নিয়েছে।

নগরীর লালখান বাজার–মুরাদপুর ফ্লাইওভারের উপর দিনেদুপুরে ফিল্মিস্টাইলে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ছিনতাইকারীদের হামলায় তিনি আহত হন। ১৩ এপ্রিল দুপুরে ফ্লাইওভারের ওয়াসা মোড়ের সন্নিকটে এ ঘটনা ঘটে।

সূত্র জানিয়েছে, টেরিবাজারের রঞ্জু মিয়া ম্যানসনের ফয়সাল এন্টারপ্রাইজের মালিক নুর হোসেন ১৩ এপ্রিল বেলা ১২টা নাগাদ দোকান থেকে নগদ ছয় লাখ টাকা নিয়ে একটি সিএনজিচালিত টেক্সি নিয়ে বায়েজিদ বোস্তামী যাচ্ছিলেন। হাজারীগলির মুখ থেকে নেয়া টেক্সিটি লালখান বাজারে গিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে। ওয়াসা মোড়ের একটু আগে টেক্সিচালক গাড়ি থামায় এবং একটি যন্ত্র ডিস্টার্ব করছে বলে নুর হোসেনকে দুই মিনিট টেক্সিতে অপেক্ষা করতে বলেন। টেক্সিচালক গাড়ি থেকে নেমে পেছনের ইঞ্জিনের দিকে এটা ওটা নাড়াতে থাকেন। এই সময় হঠাৎ করে মোটরসাইকেল আরোহী ছয়/সাতজন যুবক এসে অস্ত্রের মুখে নুর হোসেনের সব টাকা কেড়ে নেয় এবং তাকে মারধর করে টেঙি থেকে ফেলে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।ঘটনার ব্যাপারে খুলশী থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে। পুলিশ বলেছে, তারা টেক্সিটির হদিশ বের করতে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছেন, তবে গতরাত পর্যন্ত কোন হদিশ মেলেনি। ঘটনার ব্যাপারে থানায় একটি মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে বলেও টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন  বন্দরনগরীতে ওরশে আলা হযরত ও সুন্নি সম্মেলন

ব্যবসায়ী নুর হোসেন জানান, একেবারে হুট করে কয়েকজন আমাকে বেধড়ক মারধর করে টাকাগুলো কেড়ে নেয় এবং টেক্সি থেকে ফেলে দিয়ে চম্পট দেয়। বেধড়ক মারধর করায় তিনি অসুস্থ বোধ করছেন বলেও জানান। ব্যবসায়ী নুর হোসেনের বাড়ি সাতকানিয়ায়।

ট্যাক্সি থামিয়ে প্রবাসী অপহরণ: গত বছরের ২৭ অক্টোবর সকাল দশটায় সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেন ইমরান মুন্না। সোলেমান নামে এক আত্মীয় বিমানবন্দর থেকে মুন্নাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তাদের বহনকরা সিএনজি ট্যাক্সি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাঠগড় বাজার অংশে পৌঁছালে তাদের গতিরোধ করা হয়। অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের অন্য একটি গাড়িতে তুলে অপহরণ করা হয়। অপহরণের ঘণ্টাখানেক পর অক্সিজেন এলাকা থেকে অপহৃত মুন্নাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বায়েজিদ থানা থেকে সদ্য বদলিকৃত ইপিজেড থানার ওসি মো. মো. কামরুজ্জামান জানান, ঘটনার পর পর অক্সিজেন এলাকা থেকে সুমন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। প্রবাসীর খোয়া যাওয়া মালামালও উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘটনার শিকার মুন্নাকে মামলা করার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি মামলা করতে রাজি হননি।

তিন বছর পর দেশে এসে ছিনতাইয়ের শিকার: তিন বছর আবুধাবি থেকে দেশে আসে সুমন দাশ। নগরীর দেওয়ানবাজারের বাসিন্দা অমল দাস ছেলেকে আনতে যান চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে। দীর্ঘদিন কাছে পাওয়া ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা প্রবাসী সুমনের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। গত বছরের ৬ আগস্ট রাত নয়টায় নগরীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে এ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।সুমনের কাছ থেকে তারা নগদ টাকা, পাসপোর্ট, লাগেজ সবকিছু কেড়ে নিয়ে রাত ১২ টার সময় ছেড়ে দেয়। পরে সীতাকুণ্ড এলাকায় ডেকে নিয়ে সুমনকে তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়।

২৬ লাখ টাকার মালামাল লুট প্রবাসী দুই সহোদরের: হাটহাজারীর মেখলের বাসিন্দা শাহাব উদ্দিন রনি দুবাইয়ের চায়না মার্কেটের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গত বছরের ১৪ জুলাই ভোরে তিনি শাহ আমানত বিমানবন্দরে নামেন। বড় ভাইকে আনতে বিমান বন্দরে গিয়েছিলেন সালাউদ্দিন। তিনিও দুইমাস আগে বাইরাইন থেকে দেশে আসেন। সাহাব উদ্দিন জানান, বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে সকাল সাড়ে আটটায় দুইভাই প্রাইভেটকারে হাটহাজারীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। এলিভেটেড এক্সপ্রেওয়ের টোল বক্স পার হয়ে আনুমানিক দ্ইু কিলোমিটার যেতেই একটি কালো মাইক্রোবাস তাদের প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে। মাইক্রো থেকে সাত আটজন যুবক নেমে ছুরি দিয়ে প্রথমে গাড়ির চাকা ফাংচার করে দেয়। আনুমানিক ৩০-৩৫ বছর বয়সী এসব যুবকদের হাতে হাতে ওয়াকিটকি ও অস্ত্র ছিল। তারা অস্ত্রের মুখে ১০০ গ্রাম স্বর্ণের অলংকার, একটি স্যামসাং ট্যাব, একটি আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স, একটি স্যামসাং এস ২৪ আল্ট্রাসহ মোট পাঁচটি মুঠোফোন, ৫০০০ ইউএস ডলার, ৪৫০০ দিরহাম ও নগদ টাকা কেড়ে নেয়। এতে প্রায় ২৬ লাখ টাকার ক্ষতির শিকার হন তিনি।

আরও পড়ুন  ডাক্তার মৃত ঘোষণা করলেও শিশুটির মা-বাবা নিয়ে যান উজার কাছে

প্রবাসী শাহাব উদ্দিন বলেন, তারা আমাদের দুই ভাইকে খুবই মারধর করেছে। নিরাপদ মনে করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমর ধারণা ভুল ছিল। দেশে এসে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে খুবই কষ্ট পেয়েছি।