অর্থ জালিয়াতির কেলেঙ্কারিঃ রেলওয়ের দুই কর্মচারীর ‘গুরুদণ্ড’

পূর্বধারা অনলাইন ডেস্ক:

শেয়ার করুন

রেলওয়েতে অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা নতুন কিছু নয়। কর্ম ক্ষেত্রে স্বচ্ছ জবাবদিহিতা না থাকার কারনে এসব অপকর্ম হর হামাশয় হয়ে থাকে  রেলওয়েতে। দুর্নীতিবাজ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপরাধের বিচার হয় না বলেই  সকল অন্যায় ন্যায়ে পরিণত হয়। ফলে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠানে গডে উঠে  দুর্নীতিবাজদের  স্বর্গরাজ্য।  সুবিধাবাদী  রেলওয়ে কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীর কারণে প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠানটি  সুনাম হারাতে বসেছে।

পারস্পরিক যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে একই ঠিকাদারি কাজের বিল দুইবার পরিশোধ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের দুই কর্মচারীকে চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারীরা হলেন তরিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিন। তাঁরা উভয়েই লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী দপ্তরের অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর তাঁদের রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়েছে।অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে তাঁদের দুজনকেই আগামী পাঁচ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিত করা হয়েছে।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লালমনিরহাট স্টেশন থেকে রেললাইনের প্রোটেকশন ওয়ালের কাজ পায় ‘মেসার্স রিচ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই কাজের চূড়ান্ত বিল ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি অর্থনৈতিক কোড নং-৩২৫৮২০৬ থেকে ১৭,৮৯,৭৫৫.২৭৮ টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু একই বিল ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ভিন্ন অর্থনৈতিক কোড নং-৪১১১৫০১ থেকে পুনরায় একই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়, যা গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতি হিসেবে চিহ্নিত হয়।লালমনিরহাটের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন) মো. শিপন আলী বিষয়টি উদ্ঘাটন করে গত বছরের ১ ডিসেম্বর তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করেন এবং বিভাগীয় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন)-কে আহ্বায়ক করে এবং এএমই (লোকো), এএসটিই ও এডিএও-কে সদস্য করে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তাঁর প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং জানান, তরিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনের প্ররোচনায় তাঁরা এ কাজে যুক্ত হন। যদিও ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার উত্তোলিত অর্থ সরকারি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়। এদিকে অভিযুক্ত দুই কর্মচারীও লিখিত জবানবন্দিতে ‘ভুল হয়েছে’ বলে স্বীকার করলেও অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।

আরও পড়ুন  পেকুয়ায় প্রথমবারের মতো পুষ্টি স্কুল উদ্বোধন

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তরিকুল ইসলাম প্রথম বিল প্রস্তুত ও সংরক্ষণের বিষয়টি স্বীকার করলেও দ্বিতীয়বার বিল প্রদানের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে দাবি করেন। কিন্তু দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, দ্বিতীয়বার বিল প্রেরণের ক্ষেত্রেও তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন দুটি অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে একই বিল দুইবার প্রক্রিয়াজাত করেন এবং ভবিষ্যতে জালিয়াতির উদ্দেশ্যে নথি গোপন রাখেন।এছাড়া তিনি প্রথমবার বিল পাশ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নথি গায়েব করে দেন এবং পরবর্তীতে ওই কাজকে একাধিক অর্থবছরের এপিপিতে ‘ক্যারি ফরোয়ার্ড’ হিসেবে দেখিয়ে পুনরায় বিল পাশের সুযোগ তৈরি করেন। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর তিনি ঠিকাদারের প্রতিনিধি হিসেবে মো. শরিফুল হক শাকিলকে ব্যবহার করে বিলটি পুনরায় পাশ করান। শরিফুল হক শাকিল তাঁর জবানবন্দিতে জানান, পূর্বে নেওয়া ব্ল্যাঙ্ক চেক ব্যবহার করে ঠিকাদারের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে তা তরিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।অন্যদিকে রইছ উদ্দিন নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করলেও তদন্তে দেখা যায়, বিলের পিপি প্রস্তুত, অগ্রায়নপত্র লেখা, এপিপি তৈরি, বিল রেজিস্টার সংরক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। দ্বিতীয়বার বিল পরিশোধের রেজিস্টারও তাঁর হাতের লেখা বলে নিশ্চিত হয়।

এছাড়া গোপন সূত্রে জানা যায়, চাকরির পাশাপাশি রইছ উদ্দিন নিজেই ঠিকাদারি কাজ করতেন এবং তাঁর ভাই মো. রাশেদুজ্জামানের নামে ‘এ.আর এন্টারপ্রাইজ’ লাইসেন্স ব্যবহার করতেন। গত পাঁচ বছরে এই লাইসেন্সে ৮ থেকে ১০টি কাজ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তিনি নিজে কাজ না করে অন্যদের দিয়ে তা সম্পন্ন করাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত কমিটি সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে, একই কাজের বিল একাধিকবার পাশ ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন তরিকুল ইসলাম ও রইছ উদ্দিন। সে অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ‘রেলওয়ে কর্মচারী (দক্ষতা ও শৃঙ্খলা) বিধি, ১৯৬১’ অনুযায়ী গুরুদণ্ড দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক জানান, প্রায় আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সকল তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। তাই যথাযথ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  সেনবাগে কাপ-পিরিচ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী মফিজুর রহমানের কবর জেয়ারতের মাধ্যমে গণসংযোগ শুরু

লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী শিপন আলী বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন