চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় যাত্রীবাহী মারসা পরিবহণের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে চারজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের হোটেল ফোর সিজনের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
লোহাগাড়া থানার ওসি মো. আব্দুল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামমুখী একটি মারসা পরিবহণের বাসের সঙ্গে কক্সবাজারমুখী একই কোম্পানির অন্য একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে কক্সবাজারগামী বাসটি সড়কের পূর্ব পাশে একটি দোকানে ঢুকে পড়ে। সংঘর্ষে বাস দুটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করেন। গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।এদিকে দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানবাহন আটকা পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি সালাহ উদ্দীন চৌধুরী জানান, হতাহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশের ৪৪ কিলোমিটার সড়কের বাঁকে বাঁকে যেন মৃত্যুফাঁদ। এখানে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে এই সড়কে। যার পেছনে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, সংকীর্ণ সড়ক, অবৈধ দখল এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা। সব মিলিয়ে এই অংশ এখন একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ করিডর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
চিরিংগা ও মালুমঘাট হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মাসে এই অংশে ৪৫ জন নিহত এবং ৬১ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে নিহত হন ৩৭ জন এবং আহত ৪৬ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নিহত ৮ জন এবং আহত ১৫ জন। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির প্রতিফলন। গত বছরের ৫ নভেম্বর সকালে হাঁসের দিঘি ঢালা এলাকায় বাস ও নোহা গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১ জনের মৃত্যু হলে প্রাণহানি দাঁড়ায় ৬ জনে। চলতি বছরের ২৬ মার্চ ভোরে বানিয়ারছড়া এলাকায় বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই দুই আরোহীর মৃত্যু হয়। একই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি সড়কটির অন্তর্নিহিত ঝুঁকিকেই সামনে নিয়ে আসে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চকরিয়া অংশে অন্তত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। খুটাখালী, ডুলাহাজারা, মালুমঘাট, ফাঁসিয়াখালী, বানিয়ারছড়া, হারবাং ও চিরিংগা সংযোগ সড়কের এসব বাঁকে দৃষ্টিসীমা সীমিত, কোথাও সড়ক সরু হয়ে গেছে, আবার কোথাও গার্ডরেল নেই। অনেক স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডেরও অভাব রয়েছে। ফলে চালকের সামান্য ভুলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়রা এসব স্থানকে ‘মৃত্যু ফাঁদ’ বলেই উল্লেখ করছেন।সড়কের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে অবৈধ দখল। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়া অংশের ৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়ক ও এর সংরক্ষিত অংশ দখল হয়ে গেছে। সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা দোকানপাট, স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবহার কার্যত সড়কের প্রস্থ কমিয়ে এনেছে। এতে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ সড়ক, অস্থায়ী বাজার, অনুমোদনহীন স্ট্যান্ড, হঠাৎ ইউটার্ন এবং ফুটওভারব্রিজ ও সড়কবাতির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারমুখী যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে দুই লেনের সড়কটি ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তখন ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে থাকে। আরও একটি ঝুঁকির বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে লবণ পরিবহন। নিয়ম না মেনে লবণ বহনের কারণে মহাসড়কে লবণাক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ে। চিরিংগা হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মো. আরিফুল আমিন ও মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মাহাবুবুর রহমানের দাবি, তারা গতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকায় দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।