চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা না হলেও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ৪১ নং ওয়ার্ড (দক্ষিণ পতেঙ্গা) ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থী ও ভোটারদের মাঝে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়। সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ার্ডে এবার নির্বাচনের মূল আলোচনায় উঠে এসেছে সুপেয় পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, খাল খনন, লালদিয়ার চরের উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের পুনর্বাসন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিমান ঘাঁটি জহুরুল হক, নেভাল একাডেমি, কোস্টগার্ড দপ্তর সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বহু সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা এই ওয়ার্ডে অবস্থিত। কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা প্রায় ১৭: ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জনপদ বর্তমানে নগরীর দ্রুত বর্ধনশীল এলাকাগুলোর একটি। ২০২৪ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী এখানে মোট ভোটার প্রায় ৭৩ হাজার ৮২০ জন।
তবে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে রয়েছে দক্ষিণ পতেঙ্গা। এলাকায় এখনো নিরাপদ পানীয় জলের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। টিউবওয়েলের পানি লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষকে বিশুদ্ধ পানির জন্য প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি খাল ভরাট ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জোয়ার ও অতিবৃষ্টিতে মাইজপাড়া, বিজয়নগর-চরবস্তি, দক্ষিণপাড়ার কোনার দোকান সহ বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়।
এবারের নির্বাচনী আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ওয়াসার পানির লাইন সম্প্রসারণ, খাল পুনঃখনন ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ। একইসঙ্গে মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকানো এবং বিপুল সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান তৈরির দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার
পতেঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক কমিশনার ডা. নূরুল আবছার নিজেকে “পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধি” দাবি করে বলেন, অতীতের মতো এবারও জনগণের ভালোবাসা পাবেন বলে তিনি আশাবাদী। যদিও তিনি বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেননি, তবে সুপেয় পানির সংকটকে তিনি ওয়ার্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
নগর বিএনপির সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক কমিশনার ইসমাইল হোসেন তাঁর বক্তব্যে অতীত ও বর্তমান পতেঙ্গার বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একসময় কৃষিনির্ভর ও তরমুজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত এ জনপদ এখন মৌলিক নাগরিক সংকটে জর্জরিত। ওয়াসার লাইন সম্প্রসারণের অসমতা, খাল দখল ও মাদক সমস্যাকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিশেষ করে গুপ্তখাল, চরবস্তি খাল ও নিজাম মার্কেট খাল পুনঃখননের বিষয়টি তিনি অগ্রাধিকার দেন। তার ভাষায়, এসব খাল এখন “ময়লার ভাগাড়ে” পরিণত হয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে খাল পুনরুদ্ধার, ময়লা ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং কর্ণফুলী নদীপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে লালদিয়ার চরের উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ১৫০০ পরিবারের পুনর্বাসন এবং পতেঙ্গাকে নিরাপদ পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন।
পতেঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার দক্ষিণ পতেঙ্গাকে “চট্টগ্রাম মহানগরের সবচেয়ে দূরবর্তী ও অবহেলিত ওয়ার্ড” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জলাবদ্ধতা ও নিরাপদ পানির সংকটকে সবচেয়ে বড় সমস্যা আখ্যা দিয়ে বলেন, খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়।
তিনি লালদিয়ার চরের উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনকে মানবিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার বিকেন্দ্রীকরণের ওপরও জোর দেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মনোনয়ন না পেলেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির ৪১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াসও নিরাপদ পানি, মাদক নির্মূল, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে সামনে এনেছেন। পর্যটননির্ভর এই অঞ্চলে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি ও যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
যুবনেতা মাহবুব আলম ও একইভাবে সুপেয় পানি ও জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কথা বলেন। তিনি পতেঙ্গার সামরিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখনো নাগরিক সুবিধার ঘাটতি থাকা দুঃখজনক। দল মনোনয়ন দিলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলমগীর কোম্পানির নামও সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় আলোচনায় রয়েছে। যদিও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবু স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে হানিফ মোল্লা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে জনপ্রতিনিধিরা ওয়ার্ড কার্যালয়কে “জায়গা-জমির বিচারালয়ে” পরিণত করেছিলেন, কিন্তু মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ডেইলপাড়া থেকে নাজিরপাড়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জমি দূষিত পানিতে তলিয়ে থাকে, ফলে মানুষ চাষাবাদ করতে পারছে না। একইসঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া এবং খাল দখলের বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যে “সততা, ন্যায় ও জনবান্ধব প্রশাসন” গড়ার প্রতিশ্রুতি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। জামায়াতের একক প্রার্থী হওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাদের ভোট একটি নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোটারদের প্রত্যাশা : প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের প্রতিশ্রুতির চেয়ে এবার তারা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে ওয়াসার পানির লাইন সম্প্রসারণ, খাল খনন করে জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ ও যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারা দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন।
নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ৪১ নং ওয়ার্ডে বিএনপির একাধিক শক্তিশালী ও পরিচিত মুখ থাকায় দলীয় মনোনয়নই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের সাংগঠনিকভাবে একক প্রার্থী মাঠে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জমে ওঠার আভাস মিলছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ পতেঙ্গার ভোটাররা এবার শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়—কার হাতে বাস্তব উন্নয়ন, সুপেয় পানি, কার্যকর ড্রেনেজ, খাল পুনরুদ্ধার, মাদকমুক্ত সমাজ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলবে, সেটিই বিবেচনায় রাখতে চান।