চট্টগ্রাম মহানগরের রূপের রাণী দক্ষিণ পতেঙ্গা। সমুদ্র, বন্দর, বিমানবন্দর, বিমানঘাঁটি ও শিল্পাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অপরূপ সৌন্দর্যের এই পতেঙ্গার সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে উঠেছে মাদকের অভয়ারণ্য।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘নৌকার মাঝি’ থেকে উঠে আসা আলোচিত ‘ইয়াবা বদি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ইয়াবা আবছার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সেই ইয়াবা সিন্ডিকেট কখনো থেমে থাকেনি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে শুধু বদলেছে সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক পরিচয় ও নিয়ন্ত্রকের নাম।
আর এবার দক্ষিণ পতেঙ্গায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া মিয়ার নাম। স্থানীয়দের ভাষ্য— আওয়ামী লীগের সময় যেভাবে ‘ইয়াবা বদি’ আবছার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন সেই জায়গা দখল করেছেন কথিত বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া মিয়া।
এই অভিযোগের মধ্যেই জিয়া মিয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে ৬ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জিয়া মিয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ডবলমুরিং থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রোববার (১০ মে) রাতে মহানগর গোয়েন্দা (উত্তর) বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মাহমুদুল করিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন বাঁশখালীর সাধনপুর এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মো. শাহ আলম, ডবলমুরিং থানার সুপারিওয়ালা পাড়া এলাকার মো. পারভেজ এবং দক্ষিণ পতেঙ্গা দুরিয়া পাড়ার বাসিন্দা জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া মিয়া। এর মধ্যে শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হলেও জিয়া মিয়াসহ অপর দুই আসামি পলাতক রয়েছে।
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ জুন গঠিত বিএনপির চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কমিটিতে জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া মিয়াকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। তিনি পতেঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. নুরুল আবছারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন জিয়া মিয়া। নদী পথে ইয়াবা এনে নিজ বাসায় মজুত করতেন তিনি । পরে তা সেখান থেকেই পাইকারি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এলাকায় শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ পরিদর্শক মো. আফতাব হোসেনের নেতৃত্বে ডবলমুরিং থানার সুপারিওয়ালা পাড়ায় “পারভেজ ডিজেল সার্ভিস” নামের একটি ওয়ার্কশপে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এ সময় ইয়াবা কেনাবেচার সময় মো. শাহ আলমকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তার ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় ইয়াবার চালান। তবে অভিযান টের পেয়ে পারভেজসহ অন্য সদস্যরা পালিয়ে যায়।
পরে গ্রেপ্তার শাহ আলমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ দক্ষিণ পতেঙ্গার নিজাম মার্কেট এলাকার দুরিয়া পাড়ায় জিয়া মিয়ার বাসায় অভিযান চালায়। অভিযানে তার বাসার তৃতীয় তলার ড্রয়িংরুমের টি-টেবিলের নিচে টেবিল ক্যালেন্ডারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ইয়াবার প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, দুই অভিযানে মোট ৬ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
মামলার বিষয়ে পুলিশ পরিদর্শক মো. আফতাব হোসেন বলেন, “গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিসহ তিনজনকে আসামি করে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযানের সময় বিভিন্ন মহল থেকে তদবির ও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন— ক্ষমতা বদলালেও কেন থামে না ইয়াবা সাম্রাজ্য? ‘ইয়াবা বদি’ আবছারের পর এবার কি দক্ষিণ পতেঙ্গায় নতুন গডফাদার হয়ে উঠেছিলেন জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া মিয়া? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো এলাকায়।


