রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কমিশনের জালে বন্দি বিল’:নিপা ভাইরাসের কবলে হিসাব শাখা

কমিশন ছাড়া বিলের ফাইল ছাড়েন না  • ভুয়া বিলেও হাতিয়ে নেন টাকা • ভাগ যায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে

বিশেষ প্রতিবেদক:

শেয়ার করুন
বিল ছাড়ে কমিশনে, ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ; ঊর্ধ্বতনদের ভাগ-বাটোয়ারার দাবিও তুললেন খোদ কর্মচারীসহ 
ভুক্তভোগীরা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব শাখা নিপা ভাইরাসের কবলে ।প্রশ্ন উঠতে পারে ভাইরাস মানুষকে আক্রমন করে, কিন্তু হিসাব শাখায় কিভাবে ভাইরাস আক্রান্ত হয়। এটি কোন সংক্রামক প্রাণঘাতী ভাইরাস নয়, টাকা উপার্জনের ভাইরাস। রূপক অর্থে নিপা ভাইরাস । রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মাঝে দুর্নীতি আর অনিয়ম এত বেশি বেপরোয়া হয়ে গেছে যা অনেকটা ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার মতো।
সূত্রে জানায়, কাজী সাঈদা বেগম নিপা গত ১০-১২ বছর ধরে রেলওয়েতে কর্মরত রয়েছেন। স্বামীও জনতা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মরত আছেন। এই সুবাদে তিনি বেশিরভাগ সময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ও পাহাড়তলিতে চাকরি করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাকে বদলি করা হলেও ঘুষবাজিতে খুব অল্প সময়েই তিনি ফিরে আসেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবিতে।এ সুযোগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোরস এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখায় কর্মরত থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘুষ বাণিজ্যের কারখানায় পরিণত করেছেন তিনি। অবৈধ অর্থ উপার্জন করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখাকে ঘিরে উঠেছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হিসাব কর্মকর্তা (সংগ্রহ) কাজী সাঈদা বেগম নিপার প্রভাবের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে শাখাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত কমিশন ছাড়া বিলের ফাইল নিষ্পত্তি হয় না; এমনকি ভুয়া বিলের বিপরীতেও সরকারি অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়।ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে বিল জমা দেওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। অভিযোগ, বিল ছাড় করতে হলে দিতে হয় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন। কেউ কমিশন দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মাসের পর মাস আটকে থাকে তার ফাইল।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ করে বিল জমা দেওয়ার পর আমার কাছ থেকে ২ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয়। আমি কম দিতে রাজি হলেও ফাইল আর এগোয়নি। পরে বুঝতে পারি, কমিশন না দিলে এখানে কাজ হয় না।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের দাবি, কমিশন বাণিজ্য এখন শাখাটির অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ঠিকাদারদের এ দাবির মিল পাওয়া গেছে ডিএফএ/স্টোরস এন্ড প্রকিউরমেন্ট শাখা কর্মচারীদের মুখেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, কাজী সাঈদা বেগম নিপা ঘুষ বাণিজ্যের ভাগবাটোয়ার নিয়ে অফিসের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে ।
। তিনি যাই বলেন তাই সঠিক। নানা অনিয়ম দুর্নীতি করেও তিনি স্বাচ্ছন্দে রয়েছেন সঠিক তদারকি না থাকার কারণে।তিনি আরও বলেন, শাখায় একজন ডিএফএ অতিরিক্ত হিসেবে একাউন্টস বিভাগের কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন দায়িত্বে থাকলেও তিনি এ শাখার খোঁজ তেমন রাখেন না। কারণ দিন শেষে নিপা ম্যাডাম একাউন্টস বিভাগে গিয়ে দেখা করেন। দিয়ে আসেন ভাগও। এছাড়া একাউন্টস চীফের ভাগও পৌঁছায় দেন তিনি। ফলে এতো অনিয়মের পরও নিপা ম্যাডামের কিছুই হয় না।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত বিলের পাশাপাশি ভুয়া বিলের মাধ্যমেও সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করলে অনিয়মের বহু তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ডিএফএ/স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখার মাধ্যমে প্রতি অর্থবছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিল প্রক্রিয়াকরণ হয়। এই অর্থের বিপরীতে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সারাদিন কাজ করেও আমরা কোনো সুবিধা পাই না। বড় স্যারদের যোগসাজসে সব কমিশন তারাই ভাগ বাটোয়ারা করে খায়।অথচ কমিশনের টাকার অঙ্ক কোটি ছাড়িয়ে যায়।” আমাদের কিছুই করার থাকেনা।আর তার দুর্নীতির অর্থের ভাগ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও ঢাকা রেল ভবনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও চলে যায়। এমন কথা বলেই কমিশন হাতিয়ে নেন তিনি। যদিও এসব অর্থের ৮০ ভাগ মেরে দেন কাজী সাঈদা বেগম নিপা।
তাদের অভিযোগ, শাখাটিতে কার্যকর তদারকির অভাব থাকায় দীর্ঘদিন ধরে একধরনের অঘোষিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেও তা গুরুত্ব পায় না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হিসাব কর্মকর্তা কাজী সাঈদা বেগম নিপা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এটা নতুন শুনলাম। আপনাদের কাছে কি প্রমাণ আছে? ঘুষ নেওয়ার সময় সাক্ষী করে নেওয়া হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
“এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রয়েছেন, তারাই এ বিষয়ে বক্তব্য দিবেন।”আমাদের ঘরেও সাংবাদিক আছে, আমরা জানি কি করতে হয়।পরে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দিয়ে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএফএ/স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ-অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (বুকস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) শামীমা ইয়াসমিন বলেন, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘুষ নেয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তা অবশ্যই নেয় না। আপনাকেও ভাগবাটোয়ারা দেওয়া হয় প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। অভিযোগ পেলে অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে উল্লেখ করে বলেন”আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হলেও এ বিষয়ে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে, রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (পূর্ব) মো. সাহিদুর রহমান সরকারের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্তে স্বাধীন সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। নতুবা কমিশননির্ভর এই সংস্কৃতি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
(রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ/স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখার ঘুষ বাণিজ্যের অনিয়ম দুর্নীতির ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে চোখ রাখুন সাপ্তাহিক পূর্বধারা পত্রিকায়)
আরও পড়ুন  ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী-নেত্রী আনারকলির বিচার দাবী
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন