logo
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার যাত্রায় নতুন দিগন্ত
সংবাদ প্রকাশিত:

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য নতুন বিকল্প সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী (পিএবি) থেকে পেকুয়ার টইটং পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি শুধু একটি সড়ক নির্মাণ কর্মসূচি নয়; বরং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কটি সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও পরিবহন চালককে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক স্থানে পাশাপাশি দুটি বড় যানবাহন চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রায়ই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ যানজট। বহু বছর ধরে এ সড়ককে চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়নের গতি ছিল ধীর।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন পিএবি-টইটং সড়ক প্রকল্পকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারবাসীর জন্য আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারার কালাবিবির দিঘী থেকে কক্সবাজারের মাতামুহুরী (ঈদমনি) পর্যন্ত প্রায় ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ করা হবে। বর্তমানে ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কের অংশগুলো ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে, যাতে ভারী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কটি চালু হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী যানবাহনের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প করিডোর তৈরি হবে। কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করে আনোয়ারা ও বাঁশখালী হয়ে সরাসরি পেকুয়া পর্যন্ত যাতায়াত সম্ভব হবে। এতে চট্টগ্রাম শহরের ওপর চাপ কমবে এবং ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন সড়কটি চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার কমে আসবে। ফলে যাতায়াতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় সাশ্রয় হবে। পর্যটননগরী কক্সবাজারে যাতায়াত সহজ হওয়ায় পর্যটন শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রকল্পটির গুরুত্ব ব্যাপক। সরকার আনোয়ারায় যে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছে, এই সড়ক সেটিকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হবে। এতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সুফল পাবে কর্ণফুলী টানেল। প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম নদীতল টানেলটি চালুর পর প্রত্যাশিত পরিমাণ যানবাহন ব্যবহার না করায় এর সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন ১৭-১৮ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে সীমাবদ্ধ রয়েছে। নতুন সড়ক চালু হলে টানেল ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং এর অর্থনৈতিক কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারে সড়কপথে যাতায়াতে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বিকল্প সড়ক চালু হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, প্রকল্পটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী জুলাই মাসে কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিএবি-টইটং সড়ক শুধু একটি বিকল্প মহাসড়ক নয়; এটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, মহেশখালী ও কক্সবাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি কৌশলগত অবকাঠামো। বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম শহর গ্রাম সবখানে পানি আর পানি