টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। গত ৪ জুলাই রাত থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়, যেখানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। গতকাল বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম উপকূলীয় অনেক ইউনিয়নে এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।সাতকানিয়ার কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি অংশ বৃহস্পতিবার থেকে পানির নিচে রয়েছে। সীমিত আকারে যান চলাচল শুরু হলেও পানি বাড়লে আবারও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট।
বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নেই বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। অনেক এলাকায় টানা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এদিকে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজারেও বন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জেলার চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার রান্না করতেও পারছে না।
অন্যদিকে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ডুবে যাওয়া সড়ক নৌকায় পার করে দেওয়ার পর তাদের সড়কপথে গন্তব্যের উদ্দেশে পাঠানো হয়।নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সময় আরও তিন দিন বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা তদারকির দায়িত্বে প্রতিমন্ত্রী অমিত:
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা মোকাবেলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। এ দায়িত্ব পালন করবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গত শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী অমিত বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে মজুত ত্রাণসামগ্রী এবং উদ্ধার কার্যক্রম মূল্যায়ন করবেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা, জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সমন্বয় নিশ্চিত করবেন।
এ ছাড়া বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন, ত্রাণসামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম তদারকি এবং বন্যা পরিস্থিতি ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নিয়মিত সরকারকে অবহিত করার দায়িত্বও পালন করবেন তিনি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে।


