দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর ভয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ১ কোটি টাকার ডয়েচ ডিজেল ইঞ্জিনের ¯স্পেয়ার পার্টস ৮ কোটি টাকায় ক্রয়ের টেন্ডার বাতিল করেছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর। ফলে নয়ছয় থেকে রক্ষা পেল সরকারের ৭ কোটি টাকা।
তবে বিষয়টি ম্যানেজের লক্ষ্যে এই সরঞ্জাম ক্রয়ে রি-টেন্ডারে যাচ্ছে। যা লুটপাটের আরও একটি ফাঁদ বলে জানিয়েছেন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে এই সরঞ্জাম ক্রয়ে সংশ্লিষ্ট অন্তত হাফডজন কর্মকর্তা মহা টেনশনে আছেন। কারণ তারা এই ন্টেডার প্রক্রিয়ায় হাতিয়ে নেওয়া কোটি টাকা কমিশন বমি করার অবস্থায় দাড়িয়ে আছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে পাওয়া কমিশন সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা (পি-ওয়ান) আরিফুজ্জামান সিকদার, এডিশনাল সরঞ্জাম ক্রয় (এডিশনাল-সিসিএস) কর্মকর্তা রাশেদ ইবনে আকবর, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) মো. বেলাল হোসেন, অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (এডিজি-আরএস) ফখির মো. মহিউদ্দীন এবং ডিজি আফজাল হোসেনের পকেটে ঢুকেছে।
যারা যোগসাজশ করে পছন্দের ঠিকাদার আজমীন ট্রেডার্স ইন্টারনেশনাল এর স্বত্ত্বাধিকারী বিএনপি নেতা শওকত আজম খাজার মাধ্যমে ১ কোটি টাকার ডয়েচ ডিজেল ইঞ্জিনের ¯স্পেয়ার পার্টস ৮ কোটি টাকায় ক্রয় দেখিয়ে সরকারের ৭ কোটি টাকা লুটপাট করার চক্রান্ত করেছিল। এ বিষয়ে দুদকে গোপনীয় এক অভিযোগে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়।
অভিযোগ পেয়ে দুদক এই সরঞ্জাম ক্রয় সংক্রান্ত তিনটি টেন্ডারের সকল নথি ও রেকর্ডপত্র চেয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে চিঠি পাঠায়। দুদকের প্রধান কার্যালয়, ১ সেগুনবাগিচা, ঢাকা থেকে ২১ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা স্মারক নং- ০০.০১.১৫২০.৬০৪.০৩.২৬৪.২৬/চট্টগ্রাম ৫৪১২-এর মাধ্যমে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগ থেকে ই-জিপি টেন্ডার আইডি নং ১০৯৩৭৪৪, ১০৯৩৮৮৫ ও ১০৯৩৮২৬-এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বিভাগে ব্যবহারের জন্য ১৪টি আইটেমের ডয়েচ ডিজেল ইঞ্জিন ¯েপয়ার পার্টস কেনা হয়।
প্রায় ১ কোটি টাকা বাজারমূল্যের ¯েপয়ার পার্টস ৮ কোটি টাকায় ক্রয় করে সরকারের প্রায় ৭ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। অতিরিক্ত মূল্যে ক্রয়ের মাধ্যমে আত্নসাৎ করা অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদক সংশ্লিষ্ট ৩টি টেন্ডারের ক্রয় নথি, দরপত্র অনুমোদন, বাজারদর, দাপ্তরিক প্রাক্কলন, এপিপি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কৃতকার্য দরদাতার ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর, ই-টিআইএন, ভ্যাট (বিআইএন), জাতীয় পরিচয়পত্র, অভিজ্ঞতার সনদ, নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড (ঘঙঅ), চুক্তিপত্র, মালামাল সরবরাহ সংক্রান্ত তথ্যসহ যাবতীয় সত্যায়িত কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেয়।
চিঠিতে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম-কে গত ২২ জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে চাহিদাকৃত তথ্য ও রেকর্ডপত্র দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার কাছে সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের স্বার্থে অনুসন্ধান শুরু করলে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক তথ্য।
তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে গিয়ে কথা হয় প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা (পি-ওয়ান) মো. আরিফুজ্জামান সিকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুদক তথ্য চেয়েছে তথ্য দিব। আমাদের কোন ভয় নেই। কারণ এসব সরঞ্জাম এখনো কেনাই হয়নি। টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হলেও এখনো চুক্তি হয়নি। চুক্তি হলেই সরঞ্জাম ক্রয় করতে হয়। এ অবস্থায় অভিযোগের কারণে সিসিএস স্যার টেন্ডার বাতিল করে দিয়েছেন।
ঠিকাদার থেকে কমিশন খাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এ কাজে শুধু কি আমি জড়িত। এর সাথে এডিশনাল সিসিএস স্যার, সিসিএস স্যার, এডিজি-আরএস স্যার, ডিজি স্যার, ডিডব্লিউ, পিডব্লিউ সবাই জড়িত। আপনি তাদের সাথে কথা বলুন। তাদের সাথে কথা না বলে নিউজ প্রকাশ করলে তো সেটা একপেশে হয়ে যাবে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে প্রকৌশলী বেলাল হোসেন রেগে তেলে বেগুনে আগুন। এক পর্যায়ে এ প্রতিবেদকের হাতের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
ফোন কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, আপনার যা ইচ্ছে তাই লিখেন। সব বক্তব্য অনলাইনে আছে ওইখান থেকে দেখে লিখেন। আমি অনেক ঝামেলার শিকার হয়েছি তাই মোবাইল ফোন নিয়েছি। একজন প্রতিবেদকের মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে পারেন কিনা প্রশ্ন করা হলে কোন প্রকার সদোত্তর তিনি দেননি। একপর্যায়ে নিজেকে ব্যস্ততা দেখিয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়েন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (এডিজি-আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, টেন্ডারটা আর হচ্ছে নাা। এটা রি-টেন্ডারে চলে গেছে। এটা যখন হয়নি তখন এ নিয়ে কথা বলতে চাইছি না। ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন পাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বস সূলভ মন্তব্যে বলেন, কে কি বলেছে এটা আমার বিষয় নয়, কেউ যদি কমিশন নিয়ে থাকে এমন অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।