logo
প্রতিদিনের খাদ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিক, নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দেশ
সংবাদ প্রকাশিত:

প্রতিদিনের খাদ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিক, নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দেশ

সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধে মিলল উদ্বেগজনক মাত্রার প্লাস্টিক কণা; তিন গবেষণায় উঠে এলো ভয়াবহ চিত্র, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশের তিনটি পৃথক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, অজান্তেই প্রতিদিন হাজারো প্লাস্টিক কণা মানবদেহে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সয়াবিন তেলে সবচেয়ে বেশি দূষণ;

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে পাওয়া গেছে ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণা। ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষণাটি বিশ্বখ্যাত Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্রের পুনর্ব্যবহার, খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রি, সংরক্ষণে অনিয়ম এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎস। বোতলজাত তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ায় উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহনের বিভিন্ন ধাপকেও সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চিনিতেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক;

একই জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ থেকেই এসব কণা চিনিতে মিশেছে।

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যও ঝুঁকিমুক্ত নয়;

আরও পড়ুন  জরাজীর্ণ স্লুইসগেট, দখল হওয়া খাল: পেকুয়ায় জলাবদ্ধতার নেপথ্যে কারা?

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধসহ ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপেই এসব কণা খাদ্যে যুক্ত হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা;

তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ফাইবারজাতীয় কণা, যা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যে মিশতে পারে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও গবেষণাগুলো সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে মাইক্রোপ্লাস্টিককে চিহ্নিত করেনি, তবে দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা শরীরে জমে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং হৃদরোগ, অন্ত্রের জটিলতা ও স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নজরদারি জোরদারের দাবি;

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো কীভাবে মান নিয়ন্ত্রণ পেরিয়ে বাজারে এসেছে তা তদন্ত করা প্রয়োজন। সমস্যা নিশ্চিত হলে পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি অন্ত্রের প্রদাহ, হজমের সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ রোধে কার্যকর নজরদারি, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন  ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক