চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে প্রেষণে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর নিয়োগের জন্য মতামত চেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে এ প্রস্তাবের কথা জানানো হয়। চিঠিতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নৌবাহিনীর কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে প্রেষণে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে নিয়োগকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রসহ প্রস্তাবটি পরবর্তী মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে।
তবে এটি এখনো নিয়োগের চূড়ান্ত আদেশ নয়। প্রেষণে নিয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েই প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
কে এই রিয়ার অ্যাডমিরাল খন্দকার আক্তার হোসেন?
রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেন গত বুধবার বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির পঞ্চম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি নৌ প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, সামরিক প্রযুক্তি, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন।তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি একটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাডভান্সড টেকনোলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়েও জাহাজ নির্মাণবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীতে বুয়েট থেকে নেভাল আর্কিটেকচার ও হেভি ইন্ডাস্ট্রি বিষয়ে দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জন করেন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বুয়েট থেকে তিনি প্রথম ও একমাত্র পিএইচডি অর্জনকারী বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক জীবনে ইঞ্জিনিয়ারিং স্পেশালাইজেশন, পিএসসি ও এনডিসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। অত্যাধুনিক মিসাইল ফ্রিগেট ও কর্ভেটসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি, মেরিন একাডেমি, এনআইটি ও এমআইএসটিতে প্রশিক্ষক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খুলনা শিপইয়ার্ড, চট্টগ্রাম ড্রাইডক ও নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জেনারেল ম্যানেজার (শিপ বিল্ডিং), জেনারেল ম্যানেজার (প্রডাকশন) এবং জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং, ডিজাইন ও কিউসি) পদে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও সুদানে স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চীনে নির্মিত স্বাধীনতা শ্রেণির অত্যাধুনিক মিসাইল কর্ভেটের প্রধান প্রকৌশলী, স্থপতি ও নকশাকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে মেম্বার (ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী বাণিজ্যিক বন্দর, আইএসপিএস কোড বাস্তবায়ন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড, খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ও চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, দেশীয় জাহাজ নির্মাণশিল্প এবং বৃহৎ শিল্পের বিকাশে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহকারী নৌ প্রধান (ম্যাটেরিয়েল) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি), যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউশন অব নেভাল আর্কিটেক্টস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব মেরিন অ্যান্ড শিপিং প্রফেশনালসের ফেলো হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর ১৫০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব গবেষণার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন, রোবটিক্স, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ব্লু ইকোনমি, শিপ রিসাইক্লিং, শিপবিল্ডিং, জ্বালানি সমাধান, কারিগরি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান পদে তাঁর নিয়োগের প্রস্তাবটি এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত ও পরবর্তী সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।