ইয়ার্ডে তিন দশকের অখালাসকৃত কনটেইনার

চট্টগ্রাম বন্দর এনবিআরের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি

ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ;

শেয়ার করুন

আইন অনুযায়ী, জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক পণ্য গ্রহণ না করলে তা কাস্টমসের মাধ্যমে নিলাম বা ধ্বংস করার কথা। কিন্তু তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিপুলসংখ্যক অখালাসকৃত কনটেইনারের নিষ্পত্তি না হওয়ায় বন্দরের ধারণক্ষমতার একটি বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে রয়েছে। এতে অপারেশনাল সক্ষমতা কমার পাশাপাশি রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, অখালাসকৃত কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থাকায় গত তিন দশকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার নিট রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে চিঠি দিয়েছে চবক। একই সঙ্গে নিলাম আইন সংস্কার, অখালাসকৃত কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বন্দরের ইয়ার্ড খালি করতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবও দিয়েছে।বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন অখালাসকৃত কনটেইনার পড়ে থাকায় কনটেইনার ইয়ার্ডের ব্যবহারযোগ্যতা কমছে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বাড়ছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের উৎপাদনশীলতা কমছে এবং দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিপজ্জনক রাসায়নিক ও দাহ্য পণ্য দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।চলতি মাসে কাস্টমস কমিশনারকে পাঠানো এক চিঠিতে এসব ঝুঁকির কথা তুলে ধরে দ্রুত নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে চবক। চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে বাই-পেপারের মাধ্যমে কাস্টমসের কাছে কনটেইনার হস্তান্তর করে। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সময়মতো নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম শেষ করতে না পারায় ইয়ার্ড ও শেডে নিলামযোগ্য পণ্যের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
বন্দরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পি-শেডে ২৭৫ প্যাকেজ রাসায়নিক ও অন্যান্য বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১২৫ প্যাকেজ দীর্ঘদিন ধরে নিলাম বা ধ্বংসের অপেক্ষায়। এছাড়া বিভিন্ন ইয়ার্ডে ৩৩০ টিইইউ বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ টিইইউ অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত

এছাড়া বন্দরে পড়ে আছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টিইইউ ৪০ ফুট দীর্ঘ এফসিএল কনটেইনার, প্রায় ৩ হাজার ২০ ফুট দীর্ঘ এফসিএল কনটেইনার, ১ লাখ ১৭ হাজার প্যাকেজ এলসিএল কার্গো এবং সাত হাজার প্যাকেজ বাল্ক কার্গো। এসব কনটেইনার ও পণ্য দীর্ঘদিন ইয়ার্ডের মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখায় বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা কমছে এবং পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও মুখপাত্র মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কেবল পণ্য সংরক্ষণের স্থান নয়, এটি একটি চলমান অপারেশনাল ব্যবস্থা। তাই নিলাম ও ধ্বংসযোগ্য পণ্য বছরের পর বছর পড়ে থাকার বিষয়টিকে কেবল বন্দরের সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় বাণিজ্য সক্ষমতার বিষয় হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিপজ্জনক পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়মিতভাবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং দ্রুত নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়েছি।’

এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা ১০ হাজার ২২৫ টিইইউ নিলামযোগ্য কনটেইনার এখনো ইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে। এসব কনটেইনার বন্দরের মোট ধারণক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে। এতে বন্দরের রাজস্ব আয় যেমন কমছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

সংকট নিরসনে চবক একাধিক আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাই-পেপারের মাধ্যমে কাস্টমসের কাছে হস্তান্তরের পর সাধারণ পণ্যের নিলাম এক মাসের মধ্যে, বিপজ্জনক পণ্যের নিলাম দুইদিনের মধ্যে এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের নিলাম চারদিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক বিধান করার সুপারিশ করা হয়েছে।এছাড়া আদালতে মামলা চলমান থাকলেও নিলাম কার্যক্রম বন্ধ না রেখে চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে চবক। এ ক্ষেত্রে নিলামের অর্থ একটি বিশেষ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে প্রকৃত দাবিদারকে পরিশোধের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  নগরীতে ওলামা পরিষদের উদ্যোগে, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:) আগমনী বার্তায় স্বাগত র‌্যালি

নিলাম ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নিলাম আয়োজন এবং বিদ্যমান বেজ ভ্যালু পদ্ধতি বাতিলেরও প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অখালাসকৃত পণ্য বছরের পর বছর বন্দরে ফেলে রাখার প্রবণতা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের নিবন্ধন বাতিল, কালো তালিকাভুক্তি, জরিমানা এবং প্রয়োজন হলে অর্থ পাচারসংশ্লিষ্ট মামলার বিধান যুক্ত করারও সুপারিশ করেছে চবক।কাস্টমস জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারক নির্ধারিত ফ্রি টাইমের মধ্যে পণ্য ছাড় করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে বিলম্বজনিত দায় এবং স্টোর রেন্ট কাস্টমস বিভাগের ওপর বর্তানোর প্রস্তাবও দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কাস্টমস কর্তৃক জব্দ করা পণ্য দীর্ঘদিন বন্দরে না রেখে কাস্টমসের নিজস্ব গুদামে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

বন্দরের অভিযোগ পুরোপুরি মানতে রাজি নয় চট্টগ্রাম কাস্টমস। সংস্থাটির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে নিলাম কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে। এনবিআরের নির্দেশনায় ই-অকশন ও প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে অখালাসকৃত কনটেইনার নিষ্পত্তির কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের ১৮ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ই-অকশন ও প্রকাশ্য নিলামে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কনটেইনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৬১৯টি কনটেইনারের নিলাম অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে ৪৯৩টি এবং চলতি বছরের ১৮ মে পর্যন্ত আরো ৪৯৫টি কনটেইনার অপসারণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিলাম কার্যক্রম আরো গতিশীল করা হয়েছে। অখালাসকৃত পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্য পরিবেশসম্মতভাবে ধ্বংসের জন্য লাফার্জ-হোলসিমের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও চলছে।’

বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নিলাম কার্যক্রমে কিছুটা গতি এলেও তিন দশকের জমে থাকা কনটেইনার নিয়ে সৃষ্ট সংকট এখনো কাটেনি। এ অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষের ৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি, নিলাম আইন সংস্কারের প্রস্তাব এবং অখালাসকৃত কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ এখন এনবিআর ও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুন  বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বার্ষিক বনভোজন অনুষ্ঠান সম্পন্ন
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন