চট্টগ্রামে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

মনিলাল দাস ও এটিএম সেলিমের দুর্নীতি, অনুসন্ধানে দুদক

বিশেষ অডিটে ১৪ নিয়োগে অনিয়ম, অতিরিক্ত জনবল নিয়ে বোর্ডের উদ্বেগ; গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব

স্টাফ রিপোর্টার

শেয়ার করুন

রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল)-এ  দীর্ঘদিনের নিয়োগ বাণিজ্য , আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বিটুমিন বাণিজ্যে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মনি লাল দাশ  ও মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এটিএম সেলিমসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ থেকে ১৯ মে ২০২৬ তারিখে জারি করা এক স্মারকে ২০২০ সালের বিশেষ অডিট প্রতিবেদন, বিটুমিন বিপণন-সংক্রান্ত বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং এলপিজি ডিলারদের তালিকাসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বিটুমিন বিক্রিতে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অর্থ ভারত, যুক্তরাজ্য (লন্ডন) ও কানাডায় পাচারের বিষয়।

বিশেষ অডিটে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অডিট কর্তৃপক্ষ এ নিয়োগকে গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিয়োগ নীতিমালার অভাবে স্বজনপ্রীতি ও এলাকাভিত্তিক নিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সাবেক এক মহাব্যবস্থাপকের সময়ে আত্মীয়স্বজন ও নিজ জেলার প্রায় ৪০ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া ২৯টি বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর পরিচালনা ও ভাঙানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম, নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন, আমদানিকৃত বিটুমিনের মজুদে হিসাব গরমিল, ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অগ্রিম অর্থ প্রদান, অফিস স্টাফদের নামে প্রায় ১৩ কোটি টাকা অগ্রিম বিতরণ, অনুমোদনবিহীন ভাউচার ব্যবহার এবং স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগও বিশেষ অডিটে উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন  বিএনপি নেতা উদয় কুসুম বড়ুয়াকে বহিষ্কার

বোর্ড সভায় আর্থিক সংকট ও অতিরিক্ত জনবল নিয়ে উদ্বেগ
২০২১ সালের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এসএওসিএলের ৪০৬তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মার্চ ২০২১ মাসে লুব অয়েল বিপণন ও ব্লেন্ডিং কার্যক্রম থেকে কোম্পানির মুনাফা ছিল প্রায় ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, অথচ একই সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয় প্রায় ৭১ লাখ টাকা।

পরিচালনা পর্ষদের আলোচনায় অতিরিক্ত জনবল ও নিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও যাচাই করছে দুদক
দুদক বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিটুমিন বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, অডিট আপত্তি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নথি যাচাই শেষে দায়ী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে মনি লাল দাশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়া ও তিনি চট্টগ্রাম ইসকন মন্দির কৈবল্যধামের ট্রাস্টি বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য ও ডোনার।

প্রতিক্রিয়া জানতে মনি লাল দাশের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
চলবে…
দ্বিতীয় পর্বে: অবৈধ নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়, নিয়োগে প্রভাবশালী চক্রের ভূমিকা, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগের অভিযোগ এবং দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন