কাগজে কোটিপতি, বাস্তবে দিনমজুর: রেলের টাকা লুটে দুদকের জালে ১৪ কর্মকর্তা

ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম :

শেয়ার করুন
কাগজে-কলমে কোটিপতি ব্যবসায়ী, বাস্তবে দিনমজুর—এমন এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব শাখা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই অভিনব দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে।

কাগজে-কলমে তিনি ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার বার্ষিক লেনদেন করা ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন সাধারণ দিনমজুর—যিনি স্বাক্ষর করা তো দূরের কথা, তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়াশোনাই করেননি এবং কখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের আশপাশেও যাননি। প্রান্তিক এই নারী শ্রমিককে দিয়ে অভিনব কায়দায় ‘কোটিপতি ব্যবসায়ী’ সাজানোর নাটক তৈরি করে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব শাখা, সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স বিভাগ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অভিনব জালিয়াতি সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় তিন প্রতিষ্ঠানের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।

যেভাবে সাজানো হয় ‘কোটিপতি’র নাটক:

দুদক জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে ‘মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামের একটি কাল্পনিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া নথি তৈরি করা হয়।

এই কথিত প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে দাঁড় করানো হয় কোহিনুর আক্তার নামের এক প্রান্তিক নারী শ্রমিককে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চসিকের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে সরবরাহকারী শ্রেণিতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয় তাঁর নামে। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে ধরা পড়ে এক বড় গলদ—আবেদনে যুক্ত করা ছবির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির কোনো মিল নেই। প্রকৃত কোহিনুর আক্তার তৃতীয় শ্রেণি পাস একজন শ্রমিক, যিনি স্বাক্ষর ছাড়া আর কিছু লিখতে পারেন না এবং কখনো চসিক কার্যালয়ে যাননি। লাইসেন্সের আবেদনে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গেও তাঁর এনআইডির স্বাক্ষরের মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি সরেজমিনে গিয়ে ট্রেড লাইসেন্সে উল্লেখ করা ঠিকানায় ওই ব্যবসার কোনো অস্তিত্বও পায়নি দুদক।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ

অথচ রেকর্ডপত্র সঠিকভাবে যাচাই না করেই চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা মঞ্জুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই ভুয়া লাইসেন্স ইস্যু করেন।

ব্যাংকে ভুয়া হিসাব ও আইবাস++ সিস্টেমে কারসাজি

চসিকের সেই ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও জাল এনআইডি ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি-র আগ্রাবাদ শাখায় খোলা হয় ‘মেসার্স কসমোপলিটন কর্পোরেশন’ নামের এসএনডি অ্যাকাউন্ট। অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমেই বার্ষিক টার্নআউট দেখানো হয় ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। নথিতে পেশা ‘শ্রমিক’ উল্লেখ থাকা, ছবির অমিল এবং স্বাক্ষরের অসংগতি থাকার পরও ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং অফিসার মো. পারভেজ কোনো নিয়ম বা সন্দেহের তোয়াক্কা না করেই হিসাবটি খুলে দেন।
অন্যদিকে, রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের ডিএফএ/স্টোরস শাখার তিন অডিটর—পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে একই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ‘আইবাস++’ সিস্টেমে ভুয়া বিল ও টোকেন এন্ট্রি করেন। এরপর হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের আইডি থেকে তা অনুমোদিত হয়। বিল বুকস অ্যান্ড বাজেট শাখায় পাঠানো এবং গ্রহণের ক্ষেত্রেও জড়িত ছিল রেলওয়ের অসাধু কর্মচারী ও অফিস সহায়ক চক্র। হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের মূল ঠিকাদারের তথ্য যাচাই না করেই চেকে স্বাক্ষর করেন এবং নিয়ম ভেঙে অফিস সহায়ক মাকসুদুর রহমানের মাধ্যমে চেকটি কথিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে পৌঁছে দেন।

টাকা জমা, দফায় দফায়  উত্তোলন ও আত্মসাৎ:

দুদক সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেকটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইস্যু করা হয়। পরদিন (২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি) সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় সংশ্লিষ্ট হিসাবে চেকটি জমা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন  গ্রামীন ডিজিটাল ল্যাবের নতুন তিনটি সেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন

এরপর ২ জানুয়ারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৮০ লাখ টাকা, ৮ জানুয়ারি একই শাখা থেকে ৮ লাখ টাকা এবং একই দিন ধানমন্ডি প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ৫ লাখ টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়। বাকি অর্থও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপে তুলে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

দুদকের জালে ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী

রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে দুদক। যেকোনো মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অভিযুক্ত ১৪ জন হলেন:

১.  রেলওয়ে অস্থায়ী কর্মচারী,মো. হাব্বিুল্লাহ খান,  (২) রেলওয়ে প্রাক্তন অডিটর পবন কুমার পালিত (৩) রেলওয়ে জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, (৪) রেলওয়ে জুনিয়র অডিটর খোকন চন্দ্র দে (৫) রেলওয়ে হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন (৬) রেলওয়ে হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমান (৭) রেলওয়ে হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের (৮) রেলওয়ে অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান (৯) চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল (১০) চসিক সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী (১১) চসিক সাবেক কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন (১২) সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি অফিসার মো. পারভেজ (১৩) সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি রিলেশনশিপ ম্যানেজার, বিদেশ বড়ুয়া ও (১৪) সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি সাবেক ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার

এ বিষয়ে দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২ এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় কমিশন মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে এবং দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

;