নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম, প্রজ্ঞাপন জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ার করুন

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্য দিয়ে গণহত্যার অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ হলো দলটির সবধরনের কার্যক্রম।
সোমবার (১২ মে) বিকেলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
এর আগে শনিবার (১০ মে) রাতে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। তখন জানানো হয়েছিল, পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। যেহেতু গতকাল বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি ছিল এজন্য আজ প্রথম কার্যদিবসেই জারি হলো প্রজ্ঞাপন।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাদী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে সাইবার স্পেসসহ আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকাকালে নানা অপকর্মে জড়িয়ে যায়। সবশেষ গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে ঘৃণিত হয়। সেই আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই আন্দোলনে পঙ্গু হওয়া হাজার হাজার মানুষ এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে।

প্রজ্ঞাপনে যা আছে:
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর হামলা, গুম, খুন, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন নিপীড়নমূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে গুম, খুন, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, গণহত্যা, বেআইনি আটক, অমানবিক নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী কাজ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং এসব অভিযোগ দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং দেশের ফৌজদারি আদালতে বহুসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বিচারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, বাংলাদেশের সংহতি, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার লক্ষ্যে গত বছরের ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে তারা গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, উসকানিমূলক মিছিল আয়োজন, রাষ্ট্রবিরোধী লিফলেট বিতরণ এবং ভিনদেশে পলাতক তাদের নেত্রীসহ অন্য নেতা–কর্মীর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধমূলক বক্তব্য দেওয়া, ব্যক্তি ও প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের প্রচেষ্টাসহ আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। দলটি এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের মনে ভীতির সঞ্চার করা হয়েছে। এভাবে বিচার বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে বিচারের দাবীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জাম'আতের বিক্ষোভ মিছিল

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারের কাছে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকাসহ জনমনে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী সংগঠনের মতো বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এ ছাড়া সরকার যুক্তিসংগতভাবে মনে করে, সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯–এর ধারা ১৮ (১)–এর ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটি এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সমীচীন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

;