রেলওয়ের নির্বিকার ভূমিকা

রেলের জায়গায় বালুখেকোদের’ সাম্রাজ্য:সরকার বদলালেও থামেনি নৈরাজ্য

পূর্বধারা প্রতিবেদক :

শেয়ার করুন

কর্ণফুলী নদীর ওপর শতবর্ষী কালুরঘাট সেতুর দুই পাড় এখন একপ্রকার ‘বালুখেকোদের’ দখলে। রেলওয়ের শত শত একর জায়গা এবং সরকারি খাস জমি জবরদখল করে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ বালুর পয়েন্ট ও বালুমহাল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও থমকে নেই এই নৈরাজ্য; বরং রেলওয়ের ঘুমন্ত ভূমিকার সুযোগ নিয়ে লাগামহীনভাবে চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য।

মূল সমস্যা এক নজরে:

  • রেলের জমি জবরদখল: রেলওয়ের বিট ও নিরাপত্তা বেষ্টনী কেটে প্রবেশপথ তৈরি করে চলছে বালু পরিবহনের মহোৎসব।

  • যানজট ও নরক যন্ত্রণা: সেতুর পশ্চিম পাড়ে আরাকান সড়কের অর্ধেক জুড়ে ডাম্পার ও ট্রাকের স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় প্রতিনিয়ত তীব্র যানজট লেগে থাকছে।

  • প্রশাসনের বাধা ভাঙচুর: ২৫-৩০ টন ওজনের ভারী ট্রাক চলাচল রোধে উপজেলা প্রশাসনের স্থাপন করা হাইড ব্যারিয়ার (উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা) পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দিচ্ছে প্রভাবশালীরা।

  • কর্ণফুলীতে ভাঙন: নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে তীব্র রূপ নিয়েছে কর্ণফুলী নদীর ভাঙন।

রেলওয়ের নির্বিকার ভূমিকা

চলতি বছরের এক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কালুরঘাট এলাকার এই নৈরাজ্যের চিত্র উঠে এসেছিল। তখন পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন যে, কানুনগো পাঠিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও রেলওয়ের ঘুম ভাঙেনি। সরেজমিনে দেখা গেছে, কালুরঘাট খেজুরতল, ফেরিঘাট ও খালের তীর ঘেঁষে রেলের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা বালু-বিক্রয় কেন্দ্রগুলোর সুরক্ষাবেষ্টনী কেটে অবাধে চলছে ভারী ট্রাক চলাচল।

দুই পাড়েই লাগামহীন দৌরাত্ম্য

  • পশ্চিম পাড় (নগর অংশ): কালুরঘাট ও খেজুরতলা এলাকায় আরাকান সড়ক দখল করে পার্কিং করা হচ্ছে শতাধিক মিনি ট্রাক। চার লেন সড়কের অর্ধেক অংশ ট্রাক স্ট্যান্ডে পরিণত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

  • পূর্ব পাড় (বোয়ালখালী অংশ): নদীর তীর দখল করে বলগেট ও মেশিন দিয়ে সরাসরি বালু তোলা হচ্ছে। বোয়ালখালীর কধুরখীল, চরণদ্বীপ ও শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকায় বৈধ কোনো বালুমহাল না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা।

আরও পড়ুন  ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত বাঁশখালীর ফাহিমা আক্তারের পাশে তারেক রহমান

রাজনৈতিক পালাবদল, কিন্তু দখলদারিত্ব অপরিবর্তিত

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত অন্তত তিন দশক ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলটির শীর্ষ নেতারা এতে জড়িত থাকলেও, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন মোড়কে বিএনপির শীর্ষ নেতারাও এই অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িয়ে পড়েছেন। “সরকার যায়, সরকার আসে; কিন্তু কালুরঘাটের অবৈধ দখলদারত্ব ও রেলের জমি উদ্ধার হয় না”—এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রশাসনের কড়া বার্তা

অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। গত ১৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করা হলেও ৩১ অক্টোবর তা ভেঙে ফেলা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসন তা দ্রুত পুনঃস্থাপন করে।

বোয়ালখালীর ইউএনও মেহেদী হাসান ফারুক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “বোয়ালখালীতে বৈধ কোনো বালুমহাল নেই। অবৈধ বালু উত্তোলন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, রেলওয়ের সক্রিয় সদিচ্ছা এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া কালুরঘাটের এই জনদুর্ভোগ ও অবৈধ দখলমুক্ত করা অসম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন