বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও লাভজনক দুই আন্তনগর ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। সমুদ্রসৈকতে আসা পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিতে চালু হওয়া এই ট্রেন দুটির অনবোর্ড সার্ভিস পরিচালনাকে ঘিরে দেখা দিয়েছে চরম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দরপত্র কারচুপির গুরুতর অভিযোগ।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা (পিপিআর) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নির্ধারিত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পছন্দের কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে রেলের একটি প্রভাবশালী চক্র।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) বরাবর জমা দেওয়া এক অনুসন্ধানী অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি নম্বর 54.01.1500.107.05.145.25-PS-3–
রহস্যজনক ছাঁটাই ও শর্ত লঙ্ঘনের খেলা
রেল পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (সিসিএম) কার্যালয় থেকে জারিকৃত ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ (দরপত্র সূত্র: ৫৪.০১.১৫০০.১০৭.০৫.১৪৫.২৫-PS-3) অনবোর্ড সার্ভিসের কাজের জন্য মোট ২৯টি সিডিউল বিক্রি হয়। ২১টি দরপত্র জমা পড়লেও প্রাথমিক মূল্যায়ন পর্বেই কোনো যৌক্তিক বা লিখিত কারণ না দর্শিয়ে সরাসরি ৯টি বৈধ প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারদের দাবি, মূল প্রতিযোগিতা সীমিত করে পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতেই এ ছাঁটাই করা হয়েছে।
এক নজরে দুই ট্রেনের দরপত্র অনিয়ম:
🔹 পর্যটক এক্সপ্রেস (অনবোর্ড সার্ভিস):
ভুয়া অভিজ্ঞতা ও ত্রুটিপূর্ণ সনদ সত্ত্বেও ‘এন কে এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘ক্লীন সার্ভিস’-কে টিকিয়ে রেখে ৯টি বৈধ প্রতিষ্ঠানকে অহেতুক বাদ দেওয়া হয়েছে।
🔹 কক্সবাজার এক্সপ্রেস (অনবোর্ড সার্ভিস):
সিন্ডিকেটিং ও অদৃশ্য প্রভাব খাটিয়ে ‘এস এ কর্পোরেশন’, ‘মাহি এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘স্বপ্নীল অ্যাসোসিয়েশটস’-কে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ।
ভুয়া সনদ ও কাগজপত্রে ‘সবুজ সংকেত’
দরপত্রের স্পষ্ট শর্তানুসারে, অনবোর্ড সার্ভিস চালনায় ন্যূনতম ৫ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ক্যাটারিং স্টুয়ার্ডদের ন্যূনতম এইচএসসি পাস এবং স্টুয়ার্ড ম্যানেজারদের ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের নামে ৭০ লাখ টাকার লিকুইড অ্যাসেট বা তরল সম্পদের ব্যাংক সনদ থাকা জরুরি।
অথচ অনুসন্ধানে জানা যায়:
- ‘এন কে এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘ক্লীন সার্ভিস’ নামের দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের পেশাগত ও শিক্ষাগত সনদে ব্যাপক ত্রুটি ও জালিয়াতি রয়েছে।
- এসব সনদ এবং ৭০ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট যথাযথ যাচাই-বাছাই (Verification) না করেই তাদের কারিগরিভাবে যোগ্য বা ‘রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
সিসিএম সুজিত কুমার বিশ্বাসের আড়ালে পুরোনো ইতিহাসএই পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জমি লিজ জালিয়াতি, অতিরিক্ত জায়গা দখল ও বেসরকারি খাতকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে লাখ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এটিই প্রথম নয়—এর আগে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের সিসিএম হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও চারটি ট্রেনের অনবোর্ড সার্ভিসের দরপত্রে অনৈতিক লেনদেন ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সে সময় তীব্র বিতর্কের মুখে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রশাসনরেলওয়ে অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “বর্তমান সরকার ও রেলপথ মন্ত্রণালয় যখন যাত্রীসেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে নিরলস কাজ করছে, তখন মাঠপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের এমন স্বেচ্ছাচারিতা পুরো রেলওয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।” প্রশাসনের বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিসিএম সুজিত কুমার বিশ্বাসের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে জানান, “সংশ্লিষ্ট সিসিএম দপ্তরকে এ বিষয়ে যাবতীয় তথ্য ও ব্যাখ্যার জন্য ইতোমধ্যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” |

