রাজা-শিল্পীর টাকার খনি ষোলশহর দুই নম্বর গেইট রেল ক্রসিং

নগরীর ষোলশহর ২ নং গেইট রেলক্রসিং রাজা- শিল্পীর চাঁদাবাজির হাট-বাজার!

মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বিশেষ প্রতিনিধি।

শেয়ার করুন

নগরীর ২ নং গেইট ষোল শহর রেল ক্রসিং-এর রানী গেইটম্যান শিল্পী বেগম, মহানায়ক গেইটম্যান রাজা মিয়া। রাজা -রানির রাজত্বে চলে লীলা খেলা । বসিয়েছে চাঁদাবাজির হাট বাজার। এই রেলক্রসিং এখন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। গেটম্যান, আর সিগন্যাল ব্যবস্থার— অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। পথচারী ও যানবাহন চালকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

একদিকে পথচারীদের চলাচলের ফুটপাতের রাস্তা দখল করে নিয়েছে হকাররা। অন্যদিকে ২ নং গেইট রেলওয়ে ক্রসিং এলাকার রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অবৈধ হাট বাজার । এ বাজার ঘিরে মাসে ৫ লক্ষাধিক টাকার চাঁদাবাজি চলে। এর নেপথ্যে কাজ করেন গেইটম্যান “শিল্পী “ও রাজা মিয়া। দীর্ঘ সাত -আট বছর এই জায়গায় গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তারা। দীর্ঘকাল থেকে একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করার কারণে বেপরোয়া চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের।

সরকারী চাকুরী বিধিমালা লংঘন করে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশীর্বাদে দীর্ঘ সাত -আট বছর ধরে একই জায়গায় কর্মরত আছেন রাজা- শিল্পী । এইজন্য তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা পান তারা। আর এই টাকা আসে ষোলশহর দুই নম্বর গেইট রেলক্রসিং এ অবৈধ ও ভাসমান দোকান বাণিজ্য থেকে।

ট্রেনের হুইসেল বাজলেও শিল্পী ও রাজা মিয়ার হুশ থাকে না গেট বন্ধ করতে, সতর্কীকরণ সিগন্যাল, স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার, সংকেত বাতি বা সতর্কীকরণ সাইরেন মোটামুটি থাকলেও। এই এলাকার রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের গাফিলতির কারণে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই সাধারণ মানুষের। ফলে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে পথচারী ও যানবাহন চালকদের জীবন নির্ভর করছে শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব সচেতনতার ওপর।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ করা হলেও রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে আবারও বসে বাজার।সরেজমিন দেখা যায়, ২ নং গেইট রেলওয়ে স্টেশন ক্রসিং এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার। বাজারে প্রায় ২০০টি ভাসমান দোকানে সকাল-বিকেল চলে বেচাকেনা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারে প্রতি দোকান থেকে অগ্রিম বাবদ ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দোকানভেদে দিনে ২০০ -৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সবমিলিয়ে এ বাজার থেকে মাসে ৫ লক্ষাধিক টাকার চাঁদাবাজি চলে।

আরও পড়ুন  সাংবাদিক তুহিন হত্যার বিচারের দাবিতে আনোয়ারায় মানববন্ধন

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই হাটবাজারে রানী গেইটম্যান “শিল্পী ও রাজা মিয়া “দোকানগুলো থেকে ” নিজেরাই চাঁদা তোলেন। আর এই চাঁদার ভাগ চলে যায় রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পকেটেও।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, “শিল্পীর “জাতীয় পরিচয় পত্রের বয়স বৃদ্ধির ত্রুটির কারণে বিগত ২/৩ বছর যাবত সে কোন বেতন ভাতা পায় না।

প্রশ্ন উঠেছে , এতদিন সে বেতন ভাতা না পেলে সংসার চলে কিভাবে ? মূলত এসব দোকানপাট থেকে চাঁদাবাজি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তারা এসব কাজ করে যাচ্ছেন। রাজা ও শিল্পীর মধ্যে রয়েছে বেশ সখ্যতা ২ নং গেইট দোকান বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন শিল্পীর সখের রাজা মিয়া। সরজমিনে কথা বলার সময়, দুইজনের মধ্যে দেখা গেছে সেই মনোভাব। রাজার জন্য মরিয়া শিল্পী আবার শিল্পীর জন্য মরিয়া রাজাও যার ভিডিও রেকর্ড রয়েছে প্রতিবেদকের হাতে।

মঙ্গলবার ১৫ এপ্রিল, শিল্পীর কাছে দোকান বাণিজ্যের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে, তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন শিল্পী ও রাজা মিয়া। আমরা দোকান বসাই কিংবা টাকা নিই আপনারা কে বলার? সাংবাদিক হন আর যাই হোন এই নিয়ে চার্জ করার আপনারা কে? চলেন যা বলবেন আমাদের স্টেশন মাস্টার কে বলবেন এই কথা বলে জোর করে নিয়ে যান তারা।

ষোলশহর স্টেশন মাস্টার আরিফুল ইসলামের কাছে গেলে পরিচয় জানার পর গেইটকিপার রাজা ও শিল্পী কে বকাঝকা করে বলেন, আপনারা সাংবাদিকদের সাথে এরকম আচরণ করলেন কেন? ওনারা যা জানতে চাইছেন তা সুন্দর করে বলবেন। এরপরও ওদ্বত্যপূর্ণ আচরণ করেন রাজা ও শিল্পী। তবে স্টেশন মাস্টার আরিফুল ইসলাম আশ্বস্ত করেন আপনারা কিছু মনে করিয়েন না আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
স্টেশন মাস্টারের ধমক খেয়ে শিল্পী রাজা হতবিহ্বল হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রাজার জন্য ক্ষমা চাইতেন থাকেন। এমন কি রাজাকে রক্ষা করতে প্রতিবেদকের হাত ধরে ক্ষমা চাইতে থাকেন। তার কাকুতী মিনতি দেখে স্টেশন মাস্টারের কক্ষে অনেকে হতবাক হয়ে যান। কেউ কেউ মুচকি হাসি দিয়ে বলেন এরা একজনকে ছাড়া আরেকজন বাঁচবে না।

সূত্রে বলছে , এর নেপথ্যে রয়েছে রাজা শিল্পীর পরকীয়া মধুলীলা। কর্মচারীদের ভাষ্য বরিশালের মেয়ে স্বামী পরিত্যক্ত শিল্পী। রাজামিয়ার সাথে অবৈধ সম্পর্ক থাকার কারণে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন । স্বামী শিল্পীকে ছাড়লেও রাজাকে ছাড়ে নি শিল্পী। রেলওয়ে গেইটম্যানের চাকুরি করলেও বিগত দুই তিন বছর বেতন পাননা তিনি তারপরেও তার টাকার অভাব নেই। ষোলশহর নম্বর রেল ক্রসিং এ তার টাকার খনি।

আরও পড়ুন  পটিয়ায় ৫শত ইয়াবা সহ প্রেমিক যুগল আটক ...!

অপরদিকে রাজা মিয়া নোয়াখালী সেনবাগের ছেলে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন চট্টগ্রামের ঝাউতলা এলাকায়। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ঘরের পাশেই অবৈধভাবে ঘর তুলে প্রতিমাসে ৬০-৭০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেন রাজা মিয়া। একদিকে ভাড়া ঘর বাণিজ্য অন্যদিকে ষোলশহর দুই নম্বর গেইটে দোকান ভাড়া বানিজ্য যেখান থেকে প্রতি মাসে তার দুই লক্ষ টাকা চেয়েও বেশি আয় করেন।

আর এইসব টাকার ষোলশহর স্টেশন মাস্টার, আর এন বি, জিআরপি ও বাণিজ্যিক কর্মকর্তা কাছেও যায়। সূত্রে বলছে এরা প্রত্যেকে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা ভাগ পায় । ফলে রাজা শিল্পীর অপকর্মের কথা জেনেও তারা নীরবতা ভূমিকা পালন করে আসছে।

সদ্য বদলি হয়ে আসা গেইটকীপার আজাদ বলেন,এখানে যারা পুরাতন গেইটকীপার আছে তারাই মূলত জানবেন এখানকার দুর্নীতি । তবে রেল ক্রসিং ঘেসে যেভাবে দোকানপাট বসেছে তাতে ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ফেলা মুশকিল হয়ে পড়ে। দোকানদার গুলোকে মালামাল সরিয়ে নিতে বললেই তারা মার মুখী হয়ে উঠেন এবং খারাপ আচরণ করেন। নিরবে চেয়ে থাকা ছাড়া উপায় নাই। তিনি আরো বলেন বিকাল ৫ টা পর রেললাইনে উপরে মাছ বাজারে বসে, এদেরকে কিছুই বলা যায় না। কারণ এদের সাথে আমাদের লোক জড়িত। এদের সাথে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও জড়িত। ষোলশহর দুই নম্বর রেল ক্রসিং এ মোট পাঁচজন গেইটকীপারের দায়িত্ব পালন করেন, রাজা, শিল্পী, সুমন, সালাউদ্দিন ও আজাদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, জান আলীহাট স্টেশন মাস্টার, নিজাম উদ্দিন বলেন, আমার বাসা ষোল শহর ২ নং গেইট এলাকায়। ওই রেল ক্রসিং এ গেইটম্যান হিসাবে যারা দায়িত্ব পালন করেন তারা প্রত্যেকে ভাসমান দোকান বসিয়ে টাকা তোলেন। এতে পুরো রেল ক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই দোকানগুলো সরানোর জন্য আমি তাদেরকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু এরা কাউকে পরোয়া করে না। ষোলশহর রেলস্টেশন তাদের জন্য টাকার খনি।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম নগরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকার থৈই থৈই পানি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, ষোলোশহর রেল ক্রসিং এলাকায় অবৈধ দোকান বাণিজ্যের কারণে সম্প্রতি ওই স্টেশনের মাস্টার জয়নালকে বদলি হতে হয়। এর পেছনে রাজা ও শিল্পীরা দায়ী।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দারা জানান, গেইটম্যানের কাজের গাফিলতির কারণে এখানে মাঝেমধ্যে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে,তাতে প্রাণহানি হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

অটোরিকশা চালক রুবেল মিয়া জানান, রেল লাইনের পাশে শত শত দোকান থাকার কারণে ট্রেন আসার সময় অনেকেই বুঝতে পারে না,কোন দিক থেকে ট্রেন আসতেছে। একেবারেই হ য ব র ল অবস্থা।যদি রেল লাইনের আশেপাশে কোন দোকান না থাকে তাহলে এত দুর্ঘটনা হতো না। সচেতন মহলের মতে, বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগে এ বাজার উচ্ছেদ করা জরুরি।

এই বিষয়ে শিল্পী জানতে চাইলে জানান,সরকার আমাকে বেতন দেয়, আমি কেন চাঁদাবাজি করব? প্রতিদিন ভাসমান দোকান থেকে ২০০-৫০০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানান,কে বলেছে আমি চাঁদা নিই,এটা মিথ্যা কথা আপনি বল্লে কি হলো? আর আমি যদি চাঁদা নিয়ে থাকি তাহলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিচার করবে।

এই বিষয়ে জানতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ডিটিও আনিসুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কল রিসিভ করেনি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন