সাইফ পাওয়ারটেকের সাথে চুক্তির মেয়াদ বাড়ছে না ।

বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই এনসিটি পরিচালনা করবে

সরকারের কাছে মাসিক বরাদ্দ চায় ৭ কোটি টাকা, ছয় মাস পর বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ সিদ্ধান্ত

মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বিশেষ প্রতিনিধি।।

শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিতর্কিত অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেককে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগামী ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বন্দরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আর চুক্তি নবায়ন করবে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় আপাতত নিজেদের তত্ত্বাবধানে এই টার্মিনাল অপারেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এজন্য সরকারের কাছে বন্দর কর্তৃপক্ষ মাসিক ৭ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয়ের বরাদ্দ অনুমোদন চেয়েছে। প্রাথমিকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ আগামী ছয় মাস এনসিটি পরিচালনা করবে। পরবর্তীতে উন্মুক্ত দরপত্রে বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ৪টি কন্টেনার টার্মিনাল রয়েছে। চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল এনসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ (কন্টেনার ও বাল্ক) এবং পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি)। চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড় এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের কী গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতিতেও সমৃদ্ধ। ২০০৭ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিলের প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয় করে এই টার্মিনাল নির্মাণ করে। টার্মিনালটির অবকাঠামোগত নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর বিদেশি একাধিক কোম্পানি নিজস্ব বিনিয়োগে ইকুইপমেন্ট স্থাপন করে টার্মিনালটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছিল।বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নৌমন্ত্রী শাহজাহান খানের চাপের মুখে সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। এতে করে পুরোপুরি তৈরি হয়েও চালু করা সম্ভব হয়নি এনসিটি। পরবর্তীতে সাত বছর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করে এনসিটিকে ইকুইপমেন্ট সমৃদ্ধ করে। ডিপিএম পদ্ধতিতে এই টার্মিনালের পাঁচটি জেটিতে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেককে। ডিপিএম পদ্ধতিতে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মেয়াদ বেশ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ বাড়ানো চুক্তির মেয়াদ আগামী ৬ জুলাই শেষ হচ্ছে। এতে করে ৭ জুলাই থেকে এই টার্মিনালে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৮ জুন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক থেকে সাইফ পাওয়ারটেককে আর টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্বে না রাখতে বলা হয়। সাইফ পাওয়ারটেকের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটি অপারেট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে ওই বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে মসজিদের জায়গা দখল করে ঘর নির্মাণের অভিযোগ

এরই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে প্রতি মাসে ৭ কোটি টাকা করে ছয় মাসে ৪২ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় নির্বাহের বিষয়টি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনালে স্থাপিত কী গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অন্যান্য ইকুইপমেন্ট পরিচালনা এবং আইটি ব্যবস্থাপনার পরিচালন ব্যয় প্রতি মাসে ৭ কোটি টাকা হারে ৬ মাসে আনুমানিক ৪২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই খরচের অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে পত্র দিয়েছেন।

চিঠিতে আরো বলা হয়, যেহেতু বেসরকারি অপারটরের মেয়াদ আগামী ৬ জুলাই শেষ হয়ে যাবে, তাই বন্দরের আমদানি–রপ্তানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে টার্মিনাল অপারেশন সচল রাখা জরুরি। উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ করা সময়সাপেক্ষ। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই টার্মিনালটির অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সাইফ পাওয়ারটেক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের সিসিটি এবং এনসিটি টার্মিনালের অপারেটর হিসেবে কাজ করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সাইফ পাওয়ারটেকের বিরুদ্ধে সমালোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে সাইফ পাওয়ারটেক নানাভাবে সরকারি উদ্যোগটি ঠেকানোর চেষ্টা করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অবশেষে তাদের কাছ থেকে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মেয়াদ শেষে সিসিটির ব্যাপারেও নিশ্চয় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন