চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন: পরিচালক পদে ৭১ জনের মনোনয়নপত্র দাখিল

বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি, ‘ফ্যাসিবাদীদের পুনর্বাসন’ অভিযোগে উত্তপ্ত নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ

এনামুল হক রাশেদীঃ

শেয়ার করুন

শতবর্ষী বাণিজ্য সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ৭১ জন ব্যবসায়ী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর রবিবার মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে প্রার্থীরা চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

অর্ডিনারি ক্যাটাগরিতে ৪৮ জন, অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরিতে ১৭ জন এবং টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপে ৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। নির্বাচনী শিডিউল অনুযায়ী যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর আগামী ৫ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২৪টি পরিচালক পদের মধ্যে ১৮টিতে নির্বাচন হবে। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ৬ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।

অর্ডিনারি ক্যাটাগরির ১২টি পদে ৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, আর অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরির ৬টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৭ জন। নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১ নভেম্বর।

‘ইকোনোমিক রিফর্ম অব দি চিটাগং’ চাই

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্ডিনারি ক্যাটাগরির প্রার্থী আমিরুল হক বলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই। আমাদের লক্ষ্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত চেম্বার গঠন। আমরা চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সংস্কার চাই, বে-টার্মিনালের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার। কাস্টমস হয়রানি, মহাসড়কে অযৌক্তিক স্কেল বসানো—এসব থেকে মুক্তি চাই।”

বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি

নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতঘেঁষা ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে উঠেছে। বিএনপিপন্থিদের অভিযোগ—জামায়াতপন্থিরা আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল, এখন ভোটে জেতার জন্য নিজেদের রঙ বদলে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ সেজেছে। অপরদিকে জামায়াতপন্থিদের অভিযোগ, বিএনপিপন্থিরা ভোটে জেতার জন্য এমএ লতিফ পরিবারের লোকজনের সাথে আঁতাত করছে। তবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাইরে ফ্যাসিবাদী বলে সবাই ধুঁয়া তুললেও স্বার্থের বেলায় বিএনপি-জামায়াতপন্থি দুপক্ষই আওয়ামী লীগকে কাছে টেনে চেম্বারের নেতৃত্ব বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

চট্টগ্রাম সচেতন ব্যবসায়ী সমাজ ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসএম নুরুল হক অভিযোগ করেন, “আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী চেম্বারকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ পুরোটাই সাবেক এমপি এমএ লতিফের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই গ্রুপকে পুনর্বহাল করে পরিবারতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা হচ্ছে।”

আরও পড়ুন  আওয়ামী সন্ত্রাসী পাগলা মঞ্জুর করা মামলার প্রতিবাদের রানীর হাটে সংবাদ সম্মেলন

অন্যদিকে আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘ দুই দশক চেম্বার লতিফের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমরা সেটিকে লতিফমুক্ত করেছি। কারও পুনর্বাসনের জন্য নয়, সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার জন্যই আমাদের লড়াই।”

জামায়াতপন্থি ব্যবসায়ী নেতা শাহজাহান মহিউদ্দিন বলেন, “বিএনপি-জামায়াত একসাথে আন্দোলন করে ফ্যাসিবাদীদের বিদায় করেছিল। এখন নির্বাচন সামনে রেখে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রধান অভিযোগ—টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের অটোমেটিক পরিচালক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করা হোক। এ বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।”

৫ আগস্ট তীব্র গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর চট্টগ্রাম চেম্বারে এমএ লতিফের ছেলে ওমর হাজ্জাজের নেতৃত্বাধীন সর্বশেষ পরিষদ বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হয়। কিন্তু নতুন করে শিডিউল ঘোষণার পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দুপক্ষ আলাদা হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারে নতুন মেরুকরণে বর্তমানে একদিকে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। অন্যদিকে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হকের ছোট ভাই এসএম নুরুল হক। আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আছেন বিএনপিপন্থি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমিরুল হক। অন্যদিকে এসএম নুরুল হকের সঙ্গে আছে জামায়াতপন্থিদের ছায়া। তার সঙ্গে রয়েছেন জামায়াতপন্থি ব্যবসায়ী নেতা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি শাহজাহান মহিউদ্দিন। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে দুপক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ বেড়েই চলেছে। বুধবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সচেতন ব্যবসায়ী সমাজ ও ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করে। এতে চট্টগ্রাম সচেতন ব্যবসায়ী সমাজের আহ্বায়ক এসএম নুরুল হক লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। উপস্থিত ছিলেন শাহাজাহান মহিউদ্দিনও।

ব্যবসায়ীদের মতে, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বিএনপি ও জামায়াতঘেঁষা পক্ষগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে, যা চেম্বারের নির্বাচনী রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন