রেলের স্ক্র্যাপ চোরের সর্দার ঠিকাদার শাহ আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শেয়ার করুন

রেলওয়ের স্ক্র্যাপ চুরি ও লুটপাটের ঘটনা নতুন কিছু নয়। নানা কায়দায় চলছে এই স্ক্র্যাপ চুরি ও লুটপাট। এরমধ্যে টেন্ডারের আড়ালে স্ক্র্যাপ চুরি সহজ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি এমন চুরি ও লুটপাট চলছে রেলওয়ের চোরের খনি হিসেবে চিহ্নিত সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে।

আর এই টেন্ডার পেয়েছে রেলওয়ের নিবন্ধিত সমালোচিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন। যার স্বত্ত্বাধিকারী মো. শাহ আলম। যাকে বলা হয় রেলের রাজা, রেলের মাফিয়া।

মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) এ বিষয়ে এই স্ক্র্যাপের টেন্ডার দাতা রেলওয়ে পাহাড়তলি ডিপোর সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা প্রকৌশলী আল আমিনের সাথে কথা বলতে গেলে এই টেন্ডারের স্ক্র্যাপ ওজন দেখার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, রেল মানেই শাহ আলম, শাহ আলম মানেই রেল। পুরো রেলটাকে গিলে খাচ্ছে এই মাফিয়া। যা প্রকাশ করলেও আছে ভয়ঙ্কর বিপদ।

এ সময় স্ক্র্যাপের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমার দায়িত্ব শুধু স্ক্র্যাপের ওজন দেখা। স্ক্র্যাপ কি যাচ্ছে, কোন ধরণের স্ক্র্যাপ যাচ্ছে সেটা দেখার এখতিয়ার আমার নেই। সেই দায়িত্বে আছে অন্যজন। এভাবে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করা হয়েছে স্ক্র্যাপ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। এরমধ্যে একজন ঠিকাদারের প্রতিনিধি, বাকি চারজন রেলওয়ের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে রক্ষিত লাখো টন স্ক্র্যাপ থেকে ৭৬৩ টন স্ক্র্যাপের টেন্ডার পায় শাহ আলমের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন। যেখানে শুরু থেকে রয়েছে নানা কারসাজি ও বড় ধরণের ঘাপলা। এই স্ক্র্যাপ সার্ভে করার সময় গঠিত তদন্ত কমিটি ৭৬৩ টন স্ক্র্যাপ নির্ধারণ করলেও মূলত এসবের ওজন হবে ২ হাজার ৫০০ টনের মতো। যা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে অর্ধেকেরও কম দেখিয়েছে সার্ভে কমিটি।

এছাড়া বাজারে প্রতিকেজি স্ক্র্যাপ লোহার বর্তমান মূল্য ৮০ টাকার কাছাকাছি হলেও রেলের হাই লেভেলের এই স্ক্র্যাপের মূল্য ধরা হয়েছে প্রতিকেজি ৪৪ টাকা ৫০ পয়সা হিসেবে। যা বাজার মূল্যের অর্ধেক। বাজার মূল্য নির্ধারণ কমিটি এই স্ক্র্যাপ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে আরেক দফা অর্থ। তাছাড়া এই টেন্ডারের কার্যাদেশ পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ১০% কমিশন হাতিয়ে নিয়েছে। এই সুবিধা নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মুখ এখন বন্ধ। যা সর্ষের মধ্যে ভ’ত থাকার মতো।

আরও পড়ুন  বাঁশখালী-সাতকানিয়ায় পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ

এরপর গত ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় স্ক্র্যাপ পরিবহণের কাজ। এ কাজে যেখানে স্ক্র্যাপ বুঝিয়ে দিতে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের কেউ তেমন একটা উপস্থিত থাকেন না সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে। যা কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে না থাকার মতো। এ সুবাধে ঠিকাদারের প্রতিনিধি জাকির হোসেন ও সম্রাট নামে একজন শাহ আলমের নির্দেশনা মোতাবেক স্ক্র্যাপ চুরি ও লুটের মহৌৎসব চালাচ্ছে। এমন অভিযোগ রেলের ঠিকাদার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

তারা জানান, রেলে রি-ক্লেমএভল পার্টস বাপারিং লক মেইল/ফিমেইল, বাপারিং হুক, সেভেন প্লেট স্প্রিং এর মতো কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে স্ক্র্যাপের সাথে। যা যে কোন সময় কেনাকাটার নামে এসব মূল্যবান যন্ত্রাংশ বাজার মুল্যে ফের রেলে সরবরাহ করার সুযোগ রয়েছে। অথচ এসব যন্ত্রাংশ কোনভাবেই স্ক্র্যাপ নই। কোন কারণে যদি এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অযোগ্য হয় তাহলে তা ওয়ার্কশপে রিপেয়ারিং করে পূনরায় ব্যবহারের উপযোগী করার নিয়ম রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে আলাপ করতে গেলে পাহাড়তলি ডিপোর সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা আল আমিন ও পাপ্পু নামে আরেক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকদের সাথে নিয়ে সরেজমিনে দেখতে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে যান। কিন্তু যাওয়ার আগেই সে খবর পৌছে গেলে মূল্যবান যন্ত্রাংশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বলে তথ্য দাতারা জানান।

এ সময় জেলা সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, রি-ক্লেমএভল পার্টস যেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী সেগুলো নিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, যেগুলো ব্যবহার উপযোগী সেগুলো রেখে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রি-ক্লেমএভল পার্টস স্ক্র্যাপের টেন্ডারে আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি নিরবতা পালন করেন এবং দ্রুত সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড ত্যাগ করেন।

এ সময় কি পরিমাণ স্ক্র্যাপ এ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির এক কর্মকর্তা নিজের নাম বাবর পরিচয় দিয়ে বলেন, ওজন তো ইয়ার্ডে মাপা হয় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসানো অটোমেশন ওজন স্কেলে এগুলো মাপা হচ্ছে। আর ওজন দেখার দায়িত্বে দু‘জন আছেন তারা ওখানেই আছেন।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে চাঁদা না দেয়ায় দোকানে হামলা চালিয়ে মাথা ফেটে দেয়ার অভিযোগ

এরমধ্যে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড থেকে  ওজন স্কেলের দুরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এরমধ্যে ট্রাকে লোড করা মূল্যবান যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুচকি হেসে চুপিসারে তিনি বলেন, আপনাদের বিষয়টি আমি শাহ আলমকে জানিয়েছি। তিনি কথা বলবেন। নিউজ করিয়েন না। কোনরকম হেল্প লাগলে আমাদের বইলেন।

মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে এস এ কর্পোরেশনের ম্যানেজার সম্রাট পরিচয়ে বলেন, শাহ আলম স্যার বলেছেন আপনার সাথে একটু কথা বলতে। আপনি কোথায় আছেন, বসে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই। কিন্তু তিনি যা বলবেন তা কোড করা যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না ভাই আমি তো মালিক নয়। তবুও একটু বসে কথা বলতে চাইতেছি আর কি।

এ বিষয়ে জানতে বুধবার (১৯ নভেম্বর) বিকেলে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্ত্বাধিকারী শাহ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি হুয়াটসঅ্যাপ মেসেজে সাংবাদিক পরিচয়ে নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলার বার্তা প্রেরণ করলেও তিনি কোনরকম সাড়া দেননি।

সার্ভে কমিটি ও বাজার কমিটির শুভঙ্করের ফাঁকির বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম সুবক্তগীনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনিও কল রিসিভ করেননি।

((বিশেষ দ্রষ্টব্য: রেলের জমি জবর দখলে কারসাজি, রেলে যাত্রীদের খাবার সরবরাহ, এস এ করপোরেশনের সরকারি রাজস্ব ফাঁকি সহ শাহ আলমের নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে আসছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন আপনাদের প্রিয় পত্রিকা পূর্বধারায়।)

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন