‘নিরব খাদক’ নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা-পর্ব ২

পাউবোর প্রকল্পের টাকা মেরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনা-ভরণ পোষণ!

বিশেষ প্রতিবেদক:

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের টাকা মেরে তিন পার্বত্য জেলার বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনা ও ভরণ পোষণে যোগান দিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম পাউবোর রাঙামাটি ডিভিশনের ‘নিরব খাদক’ হিসেবে পরিচিত নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা।

গত ৭-৮ বছর ধরে তিনি চট্টগ্রাম পাউবোর পানি ভবন কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। সরকারি নিয়ম রক্ষা করতে এই সময়ে তিনি সেকশন বদলির কৌশল নিয়ে ঘুরে-ফিরে পানি ভবনে থেকে গেছেন। আর সরকারের উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের টাকা মেরে জাত ভাই পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন।

এমন অভিযোগ পাউবোর ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের। যারা ঠিকাদারি কাজ না পাওয়ার ভয়ে নানা রকম দূর্নীতি ও অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত করছেন না। এ বিষয় জানতে চাইলে-একাধিক ঠিকাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ভাই ব্যবসা করে ভাত খাচ্ছি সেটাও কেড়ে নিবেন না কি?

একপর্যায়ে নাম প্রকাশ না করার কথা জানালে ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরার বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির তথ্য ফাঁস করেন।

ঠিকাদাররা জানান, চট্টগ্রাম পাউবোর রাঙামাটি ডিভিশনের আওতায় চট্টগ্রাম জেলার রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন হয়। এসব প্রকল্প থেকে ৭-১০% কমিশন নেন নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা।

এর বাইরে নানা কৌশলে সমস্যা দেখিয়ে প্রকল্পের আরও ৩-৫% টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। তবে সেই প্রকল্প যদি পার্বত্য জেলার হয় তাহলে ওই কাজ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা নেন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের জন্য। সে কাজে মূখ্য ভুমিকা পালন করেন নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা।

প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা ঠিকাদারদের প্রায়ই বলে থাকেন, পাহাড়ে গ্রুপগুলোকে টাকা না দিয়ে প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন করা যাবে না। তাদের দাবিকৃত চাঁদা দিয়েই প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া তিনি নিজেও প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে পাওয়া কমিশন, এমনকি বেতনের টাকা থেকে প্রতিমাসে টাকা দেন বলে জানান।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম 'মাওশি' হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিন দেবে এ কে খান ফাউন্ডেশন

ঠিকাদাররা জানান, তয়ন কুমার ত্রিপুরা গত ৭ বছর আগে চট্টগ্রাম পাউবোর পানি ভবনে রাঙামাটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এর তিন বছর পর এই পানি ভবন কার্যালয়ে পওর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর দু‘বছর পর ফের রাঙামাটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে অদ্যাবধি কর্মরত আছেন।

এই সময়ে তিনি প্রায় ৫-৭ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। যেখান থেকে তিনি কমিশন বাবদ অন্তত ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন। যার সিংহভাগ টাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনা ও ভরণ পোষণের জন্য প্রদান করেছেন তিনি।

প্রায় প্রতিমাসে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একাধিক প্রতিনিধি চট্টগ্রাম পাউবো কার্যালয়ের পানি ভবনে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। যাদের তিনি হয় আত্নীয়, না হয় ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন। যাদের মাধ্যমে সুকৌশলে প্রকল্প থেকে মেরে দেওয়া অর্থ তিনি প্রেরণ করেন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে।

এছাড়া পানি ভবনের রাঙামাটি ডিভিশনকে তিনি পাহাড়িদের তীর্থস্থান বানিয়ে রেখেছেন। এই ডিভিশনে অন্তত ৮-১০ জন পাহাড়ি কর্মকর্তা-কর্মচারি তার অনুগত হিসেবে কাজ করছেন। যাদের প্রত্যেকেই পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতবাদী সন্ত্রাসীদের সাথে কোন না কোনভাবে যোগসাজশ রয়েছে।

এছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার রয়েছেন। যারা নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরার ঘনিষ্ট আত্নীয় হিসেবে পরিচিত। যাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্প কাজ ভাগিয়ে নেন তিনি। এক্ষেত্রে পাহাড়ি ঠিকাদার ছাড়া পাহাড়ে প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে পাউবোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বুঝান। মূলত এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরার নিজস্ব।

এ বিষয়ে জানতে পাউবোর রাঙামাটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা কেটে দেন। পরে হুয়াটস অ্যাপের মেসেজ অপশনে প্রশ্ন লিখে বার্তা প্রেরণ করলেও তিনি কোনরকম উত্তর পাঠাননি।

তবে এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে ফোনে কথা বলেন পাউবোর আরেক নির্বাহী প্রকৌশলী। যার অনুরোধের কারণে নাম গোপন রাখা হচ্ছে। ওই প্রকৌশলী বলেন, আপনি স্যারকে খুব খারাপ মেসেজ লিখে পাঠিয়েছেন। একজন সাংবাদিক এ ধরণের মেসেজ কখনও পাঠায় না।

আরও পড়ুন  টেকনাফে ৩৬ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ

প্রতি উত্তরে এই প্রতিবেদক বলেন, এটা খারাপ মেসেজ নয় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়। আপনিও তো একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, আপনিই বলেন, প্রশ্নগুলো কি অমূলক? এমন প্রশ্নের জবাবে ওই প্রকৌশলী বলেন, এটা তো ভাই সবাই জানে পার্বত্য জেলায় যে কোন কাজ কৌশলে করতে হয়। গ্রুপগুলোকে সহযোগীতা করতে হয়। তা না হলে কাজ করা সম্ভব হয় না। আর এ কারণে তাদের পৃষ্ঠপোষক হবেন সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

উল্লেখ্য, রাঙামাটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরার নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সাপ্তাহিক পূর্বধারা পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয় গত রবিবারের সংখ্যায়। প্রতিবেদনে প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগের অসভ্য নেতা হিসেবে পরিচিত ড. হাসান মাহমুদের দোসরের তথ্য প্রকাশ পায়।

এর আগে এ বিষয়ে জানতে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা পূর্বধারাকে বলেন, ভাই কথায় আছে মাছের রাজা পাবদা, চাকরির রাজা ওয়াপদা। এই চেয়ারে বসে কমিশন ছাড়া প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না। হাসান মাহমুদকে বশে রাখতে হয়েছে, তাও মিথ্যা না। তিনি মন্ত্রী ছিলেন। তাই তাঁকে সন্তুষ্ট রাখতে হয়েছে। তবে এসব লিখে লাভ কি? নিউজ-টিউজ করার দরকার কি? আপনার জন্য আমি কি করতে পারি সেটা বলুন।

(বি:দ্র:- তৃতীয় পর্বের জন্য সঠিক তথ্য থাকলে তা পাঠানোর অনুরোধ রইল। তথ্য দাতাদের নাম ও পরিচয় গোপন রাখা হবে)

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন