বন্যার পানিতে ডুবে গেছে আমন ধানের ক্ষেত, সবজির জমি,মাছের ঘের ও চিংড়ি প্রকল্প। অনেক এলাকায় ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। কৃষক ও মৎস্যচাষিদের বছরের একমাত্র সম্বল মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। বসতভিটা, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি এবং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও পানিতে নষ্ট হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
প্রায় পুরো পশ্চিম বাঁশখালী চার দিন ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন।পুরো উপজেলায় প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প বন্ধ, মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, দুর্বল হয়ে পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্কও। ফলে অনেক পরিবার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। রাত নামলেই পুরো এলাকা ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।
বন্যার কারণে উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। ইউনিয়নের ভেতরের বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়কে কোমরসমান পানি থাকায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোরও কোনো রাস্তা নেই।অনেক এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা এখন নৌকা।তবে সব জায়গায় নৌকাও পৌঁছাতে পারছে না। ফলে খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যদিও উপজেলা সদরের সঙ্গে সংযোগকারী চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে,তবে ইউনিয়ন পর্যায়ের অধিকাংশ সড়ক ডুবে থাকায় দুর্গত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছাতে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় ২০০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ ও খাবার নেই। অসুস্থ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধেরও তীব্র অভাব রয়েছে। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ অন্ধকারে গাদাগাদি করে দিন-রাত কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় যুবক আব্দুর রহমান মোবাইল ফোনে জানান, ‘পশ্চিম বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এখনো অনেক এলাকায় বড় পরিসরে ত্রাণ পৌঁছায়নি। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।’
বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,’১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আর দেখিনি। চারদিকে শুধু পানি। ঘরে খাবার নেই, বিদ্যুৎ নেই, যোগাযোগ নেই। পরিবার নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকব বুঝতে পারছি না।’
সরল এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আমিন বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। চারদিকে পানি থাকলেও খাওয়ার নিরাপদ পানি নেই।’
কদমরসূল এলাকার বাসিন্দা কমাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,’আমার শেষ সম্বল ছিল একটি গরু। জীবন বাঁচাতে সেটিও রেখে পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে এসেছি। তিন দিন ধরে রান্না করা খাবার খেতে পারিনি। কী খাব, কোথায় যাব কোনো উপায় নেই। চারদিকে শুধু পানি। আমরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়।’
গন্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, থৈ থৈ পানি আর পানি । পানি যাওয়ার কোন রাস্তা নাই।মাছের প্রজেক্টের নামে মানুষকে পানি-বন্দী রেখে জিম্মি করে রেখেছে এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তিরা। এখানে কথা বলার জন্য কোন জনপ্রতিনিধি নাই। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করছে হাজার হাজার মানুষ। উপকূলবাসী এই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চায়।
স্থানীয়দের দাবি,বাঁশখালীর উপকূলীয় জনপদ এখন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও বিদ্যুতের সংকটে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে।শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে। তাদের একটাই দাবি দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, চিকিৎসাসেবা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা করা হোক।
এদিকে বন্যার পাশাপাশি বাঁশখালীর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উপজেলায় থাকা ১২১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র।জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ছনুয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, খানখানাবাদ, সাধনপুর, বাহারছড়া, সরল, কাথারিয়া ও পুঁইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার ২৮টি আশ্রয়কেন্দ্র এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ছনুয়া ইউনিয়নের মান্নানপাড়ার বাসিন্দা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মুফিজুর রহমান আশিক বলেন, ‘১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পরও উপকূলীয় আটটি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের তুলনায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নেই। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও ৩০ থেকে ৩৫টি আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন।’
তিনি বলেন,’টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারে হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা জরুরি।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমীন জানান,’সরকারি ত্রাণসামগ্রী পাওয়া মাত্রই দ্রুত দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে মাইকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’
দুর্যোগের পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় বাঁশখালীর মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বিদ্যুৎহীনতা, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে লাখো মানুষ এখনও অপেক্ষা করছেন কার্যকর সহায়তার।


