টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, রাজাখালী ও মগনামা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
(যে ইউনিয়ন গুলোতে জলবদ্ধতা হওয়ার কথা নয়)
এতে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার একর মৎস্যঘের প্লাবিত হয়ে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীদের দাবি, এ ঘটনায় অন্তত তাদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্লুইসগেট, জরাজীর্ণ পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই এ বিপর্যয়ের মূল কারণ।
শনিবার (১১ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মৎস্যঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির চাপে ঘেরের বাঁধ ভেঙে ও উপচে হাজার হাজার টন চিংড়ি, কোরাল, ভেটকি, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ খোলা পানিতে চলে গেছে। এতে এক মৌসুমের বিনিয়োগ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শত শত মৎস্যচাষী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানটিয়া, রাজাখালী ও মগনামা ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে কুতুবদিয়া চ্যানেল, মাতামুহুরী নদী, কাটাফাঁড়ি ও ভোলা খাল থাকলেও কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। বহু সরকারি স্লুইসগেট বছরের পর বছর সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। আবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্লুইসগেট স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রয়োজনমতো গেট পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই হাজারো একর মৎস্যঘের ও জনবসতি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। এরপর আর প্রয়োজনীয় সংস্কার কিংবা নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ না হওয়ায় প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
তাদের দাবি, সম্প্রতি সোনালী বাজার এলাকার স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে । ফলে দ্রুত পানি নামতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকার মৎস্যঘের প্লাবিত হয়েছে।
এছাড়া উজানটিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের স্লুইসগেটটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে । ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রূপালী বাজারপাড়া বড় নাসির পানি নিষ্কাশন খাল স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সৈতক বাজারের স্লুইসগেটের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন, আর ২ নম্বর ওয়ার্ড পশ্চিম উজানটিয়ার স্লুইসগেটও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় করিমদাদ মিয়া চৌধুরী বাড়ীর নূরুল কায়েস বলেন,আমাদের উজানটিয়ায় পাহাড়ী ঢলের পানি আসেনি।অতিবৃষ্টির কারণে জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের যে স্লুইসগেটটি আছে তার সামনে তিনটা বাঁধ দেওয়া হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের খালটি সম্পূর্ণ দখল করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না তাই বলা যায় এই জলাবদ্ধতা মনুষ্য সৃষ্ট।
অন্যদিকে দক্ষিণ মগনামার কাঁকপাড়া এলাকার স্লুইসগেটও প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সাবমেরিন নৌঘাঁটির নির্মাণকাজে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে স্লুইসগেটসংলগ্ন অংশ দেবে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি বের হতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
মৎস্যঘেরের ইজারাদার ও এমইউপি সদস্য শাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ বেলাল, মিজানুর রহমানসহ ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা বলেন, “মৎস্যচাষই আমাদের একমাত্র জীবিকা। প্রতিবছর একই সমস্যায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত স্লুইসগেট সংস্কার, প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সরকারি ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা দিতে হবে।”
এ সময় শতাধিক মৎস্যচাষী ও শ্রমিক একত্রিত হয়ে স্লুইসগেট সংস্কার, দখলমুক্তকরণ এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেন।
তারা বলেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পেকুয়ার মৎস্যখাত ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুচ চৌধুরী বলেন, “পাহাড়ি ঢলের পানি নয়, মূল সমস্যা পানি নিষ্কাশনের জটিলতা। ইউনিয়নের সরকারি পাঁচটি স্লুইসগেটের মধ্যে চারটিই দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ। শরৎঘোনা এলাকার ৪০ নম্বর স্লুইসগেট আমি নিজস্ব অর্থায়নে সংস্কার করেছি। স্লুইসগেটগুলো সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্লুইসগেটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুরোনো পাইপ পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করা হবে। সোনালী বাজার স্লুইসগেটে দুটি নাসির পরিবর্তে একটি নাসি বসানো হয়েছে—এ অভিযোগ সঠিক নয়। সেখানে দুটি নাসিই রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।”
এদিকে সচেতন মহলের দাবি, পেকুয়ার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সামগ্রিক অবস্থা তদন্ত করে স্লুইসগেটগুলোকে প্রভাবমুক্ত করা, খাল-নদী পুনঃখনন, জরাজীর্ণ অবকাঠামোর দ্রুত সংস্কার এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হলে প্রতিবছরই মৎস্যচাষীদের এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।


