সমুদ্রের নিচে সম্ভাবনার ভাণ্ডার: ভারত-মিয়ানমার গ্যাস পেলেও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?

মইনুল ইসলাম একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

মিয়ানমার সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের (টিসিএফ) বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদের সন্ধান পেয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এরও আগে, প্রায় ২৩ বছর আগে সেন্টমার্টিন-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কার করে দেশটি, যা এখনো চীনে রপ্তানি করছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি—এ প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে।
২০০৯ সালে সেন্টমার্টিন সংলগ্ন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে দক্ষিণ কোরিয়ার দাইউ (Daewoo) কোম্পানি কাজ শুরু করতে গেলে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা জিতে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) লাভ করে। সেই বিতর্কিত এলাকাও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সমুদ্রসীমার মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন সেখানে কার্যকর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এগোয়নি?
সমালোচকদের মতে, গত দেড় দশকে দেশের জ্বালানি নীতি ক্রমেই আমদানিনির্ভর এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এতে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী লাভবান হলেও দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান অবহেলিত হয়েছে। একই সময়ে ‘ব্লু ইকোনমি’ নিয়ে নানা আলোচনা ও সেমিনার হলেও বাস্তবে সমুদ্রসম্পদ আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
একসময় মিয়ানমারের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে নেওয়ার প্রস্তাবও এসেছিল। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ট্রানজিট বা ‘হুইলিং চার্জ’ পেত এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বাজারদরে গ্যাস কেনার সুযোগও থাকত। তবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় সে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। আজ যখন দেশে গ্যাসসংকট প্রকট এবং প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে এলএনজি ও কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে, তখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, মিয়ানমারের গ্যাসক্ষেত্র যে ভূ-কাঠামোর ওপর অবস্থিত, তার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাতেও রয়েছে। ফলে একই ধরনের গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের জলসীমায়ও থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি (ONGC) বাংলাদেশের কয়েকটি অফশোর ব্লকে দীর্ঘদিন অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোনো আবিষ্কারের খবর দেয়নি। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, অনুসন্ধানে গতি ছিল না এবং এ নিয়ে নানা প্রশ্নেরও জন্ম হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ প্রমাণ ও সরকারি ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নিজেদের গভীর সমুদ্র এলাকায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক তথ্যও উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কয়েক বছর আগে এক্সনমোবিল আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত তারা টেন্ডারে অংশ নেয়নি।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও মিয়ানমার সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে থেকেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার মালয়েশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশকে বাংলাদেশের অফশোর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলা নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বহুদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানে নতুন গতি আসতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। সমুদ্রসীমার অধিকার অর্জন ছিল একটি ঐতিহাসিক সাফল্য; এখন প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ পরিকল্পনা, স্বচ্ছ নীতি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই বিশাল সমুদ্রসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এ কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশিদের জন্য আমিরাতের ভিজিট ভিসা চালু
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন