রেলে দেশি-বিদেশি সরঞ্জাম কেনাকাটায় কোটি কোটি টাকা লুটপাট অনেক বড় ইতিহাস। এ নিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলি রেলওয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষণে ক্ষণে বয়ে গেছে অনেক ঝড়-ঝাপ্টাও। তাও রেলের আভ্যন্তরীণ নয়, হয় গণমাধ্যমের সংবাদ, নয় দুদকের অভিযানে। যা থেমে যায় শুধুমাত্র বদলিতে।
বিভিন্ন সময় লুটপাটে জড়িত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যায়নি কারও চাকরি। বরং প্রমাণ মুছে দিতে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে লুটপাটের ঘটনাগুলোকে। যার কারণে কোনকালে এক মিনিটের জন্যও থেমে থাকেনি রেলওয়ে দূর্নীতি-অনিয়ম ও লুটপাট।
তম্মধ্যে সেই রেলওয়ের পাহাড়তলি সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে নতুন করে শুরু হয়েছে আরপিও (রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার) নামক একধরণের কেনাকাটা। যা প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বা এডিশনাল সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা নিজ ক্ষমতাবলে করতে পারেন রেলের সরঞ্জাম ক্রয়।
চলতি বছরের ৩ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে এই প্রক্রিয়া। এই কেনাকাটার অন্যতম আকর্ষণ পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে কেনাকাটা করা। যেখান থেকে ইচ্ছেমতো কমিশন আদায় ও নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয় করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করার অবর্ণনীয় সুযোগ নিচ্ছেন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তারা।
তবে কথায় আছে প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ঠিক সেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে ঠিকাদারদের মধ্যে। যেখানে বলা হয়েছে পছন্দের ঠিকাদার, সেখানে বঞ্চিত ঠিকাদাররা ক্ষুব্দ হয়ে উঠেছেন। যাদের কারণে বিষয়টি এখন সামনে এসেছে। আগে যেখানে লুটপাটে কর্মকর্তা-ঠিকাদার একাকার ছিল, সেখানে এখন চির ধরিয়েছে আরপিও।
ঠিকাদারদের মতে, রেল প্রতিষ্ঠার পর থেকে রেলের সরঞ্জাম কেনাকাটায় চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়মে কেনাকাটা শুরু করেছে রেলওয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর। সেই নিয়মের নাম “আরপিও”। আর এই নিয়মে গুটি কয়েক পছন্দের ঠিকাদার কাজ পাচ্ছে। বাকিরা আঙুল চুষছে।
সূত্র মতে, রেলওয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের অধীনে ৭০০‘রও বেশি ঠিকাদার-সাপ্লাইয়ার্স রয়েছে। যারা আগে এলটিএম, ওটিএমসহ নানা সিষ্টেমে কাজ পেত। যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কমিশন দিতে হতো সিসিএস/এডিশনাল সিসিএসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ৭ কর্মকর্তাকে।
এ বিষয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে অভিযান ও মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর কেনাকাটার ধরণে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। শুরু হয় ইজিপি খেলা। যেটা কর্মকর্তাদের জন্য এখন হাতের মোয়া। গণমাধ্যম ও দুদককে ফাঁকি দেওয়ার অন্যতম কৌশল এই ইজিপি। এরপরও গণমাধ্যমের চোখ এড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। যাদের প্রত্যেকে দুদকের কোন না কোন মামলায় এখন আসামি।
তারাও লুটপাটের বিষয়গুলোকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে দুদক ও গণমাধ্যমকে বিব্রত করার চেষ্টায় লিপ্ত আছে। সেই সাথে অনিয়ম-কারসাজিও চালাচ্ছেন। নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির মধ্যে নতুন করে শুরু করেছে আরপিও খেলা। দূর্নীতির বরপূত্র আনোয়ার হোসেন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে এডিশনাল সিসিএস হিসেবে যোগদানের পর থেকে শুরু হয় আরপিও কেনাকাটায় লুটপাটের উৎসব। তিনিই হচ্ছেন নতুন এই খেলার কারিগর।
সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আনোয়ার হোসেন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে যোগদানের পর আরপিও কেনাকাটার জন্য রেলভবনে আবেদন করেন। প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল উদ্দিন সরকার ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিন আবেদনে স্বাক্ষর করে তা রেলের দূনীতির মহারাজা হিসেবে খ্যাত মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি সেই আবেদনে চোখ বুজে সই করে দেন।
এরপর ৩ আগস্ট থেকে শুরু হয় আরপিওতে কেনাকাটা। আর গত এক মাসে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনাকাটার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। যা রেলওয়ে পাহাড়তলি সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে বিগত যে কোন মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ রেকর্ড। আর এসব কেনাকাটা করা হয়েছে পছন্দের ৩-৪টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে। যেগুলোর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রকৃত ঠিকাদাররা আরপিওতে কাজ পেয়েছে তার বাস্তব কোন প্রমাণ নেই।
ধারণা করা হচ্ছে, রেলওয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তারা নামে-বেনামে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সরঞ্জাম কেনাকাটার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে। এতে আরপিওর কেনাকাটায় বড় ধরণের দূর্নীতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। যা চলছে সম্পূর্ণ গোপনে। এতে আঙ্গুল ফৃুলে কলাগাছ হচ্ছে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, এডিশনাল সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকসহ ৭ কর্মকর্তার।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের এডিশনাল সিসিএস আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি ছুটিতে আছি ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এরপর অফিসে আসলে এ বিসয়ে আপনার সাথে কথা হবে। এ কথা বলে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।
প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে বিষয়বস্থু লিখে প্রেরণ করা হলেও তিনি কোন সদুত্তর পাঠাননি। এমনকি পাহাড়তলি সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা পাহাড়তলি নিজ কার্যালয়ে অফিস করেন না। তিনি মাসে ২ বারও আসেন না। কোন কোন মাসে একেবারেই আসেন না। ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য ঢাকায় যেতে হয় ঠিকাদার-সাপ্লাইয়ার্সদের।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, আরপিও এক সপ্তাহ আগে স্থগিত করা হয়েছে। এটা তো চলমান না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরপিও নিয়ে নানা রকম অভিযোগ আসায় এটা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। কেনাকাটা রেলওয়ের আগের নিয়মেই চলবে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, আরপিও এখনো পর্যন্ত চালু আছে। আরপিওর বাইরে কোন কেনাকাটা হচ্ছে না। চলছে লুটপাটের উৎসবও। তবে ধরি মাছ না ছুঁয় পানির মতো করে এই কার্যক্রম চালাচ্ছে। দায় সারাতে দূর্নীতির কারিগর এডিশনাল সিসিএস আনোয়ার হোসেন ছুটির কথা বলে অফিস করছেন না। তবে চট্টগ্রামে নিজ বাসায় বসে তিনি আরপিওর কাজ সারছেন।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের অফিসিয়াল নাম্বারে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ কারণে তার বক্তব্য সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।
আসছে দ্বিতীয় পর্ব…..

