বর্ষা প্রকৃতিকে নবজীবন দেয়। নদী-খাল-বিল ভরে ওঠে, সবুজে সজীব হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু সেই বর্ষাই যখন একটি পাঠাগারের দরজা বন্ধ করে দেয়, বইয়ের তাক ডুবিয়ে দেয় পানিতে, আর শিশু-কিশোরদের জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে থমকে দেয়—তখন বৃষ্টির সৌন্দর্যও বিষাদের প্রতীকে পরিণত হয়। টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি ও উপকূলীয় বিজ্ঞান ক্লাব এখন পানিবন্দী। কক্ষের ভেতরে জমে থাকা পানিতে বইয়ের তাক, আসবাবপত্র এবং বিজ্ঞানচর্চার বিভিন্ন উপকরণ ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু একটি ভবন নয়, পানির নিচে যেন ডুবে যাচ্ছে উপকূলের অসংখ্য শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তরুণের স্বপ্ন। প্রতিবছর বর্ষা এলেই এই পাঠাগার জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। ফলে নিয়মিত পাঠচর্চা, পাঠকক্ষের কার্যক্রম এবং বিজ্ঞান ক্লাবের আয়োজন স্থবির হয়ে যায়। টানা বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত আর্দ্রতায় মূল্যবান গ্রন্থ, আলমারি, টেবিল-চেয়ারসহ শিক্ষা-উপকরণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছনুয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাহাদুর আলম বলেন, প্রতিবছর বর্ষাকালে পাঠাগারটিতে দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বই সংরক্ষণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু একটি পাঠাগার নয়; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ পাঠক এখানে পড়াশোনা করতে আসেন। একই ভবনে পরিচালিত উপকূলীয় বিজ্ঞান ক্লাব নিয়মিত বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান সংলাপ, সেমিনার এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। কিন্তু বর্ষা এলেই এসব কার্যক্রম থমকে যায়। পাঠাগারের সভাপতি সাঈফী আনোয়ারুল আজীম জানান, এ বছর টানা চার দিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। শুধু চারপাশ নয়, ভবনের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। গ্রন্থাগারিকরা বই ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রন্থাগারিক রেশমিনা বলেন, প্রত্যন্ত উপকূলীয় এই জনপদে পাঠাগারটি শিশু-কিশোর ও তরুণদের জ্ঞানচর্চার অন্যতম আশ্রয়স্থল। তাই প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
পাঠাগার কর্তৃপক্ষ জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভূমি উঁচুকরণ এবং একটি টেকসই ভবন নির্মাণ করা গেলে প্রতিবছরের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে। একটি নিরাপদ ও আধুনিক পাঠাগার শুধু বই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনাকেও রক্ষা করবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি এবং দাতা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এলাকার শিক্ষার্থীদের ভাষায়, এই পাঠাগারই তাদের স্বপ্ন গড়ার ঠিকানা। বর্ষা এলেই যখন এটি পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন শুধু পড়াশোনাই ব্যাহত হয় না, থমকে যায় ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও। তাই প্রতিবছরের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে দ্রুত স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়নের দাবি তাদের। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরি বর্তমানে প্রায় সাড়ে নয় হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থী, গবেষক, চাকরিপ্রার্থী ও বইপ্রেমীদের জন্য জ্ঞানচর্চার এক নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বিজ্ঞান ক্লাব বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তুলতে নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। অথচ প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে এই আলোকবর্তিকার পথচলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলের এই পাঠাগার কেবল ইট-কাঠের একটি ভবন নয়; এটি হাজারো শিক্ষার্থী, তরুণ ও বইপ্রেমীর স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং আলোকিত ভবিষ্যতের প্রতীক। তাই এই প্রতিষ্ঠানকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি পাঠাগারকে বাঁচানো নয়, বরং একটি প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।


