‘১৩ নভেম্বরই পৃথিবী ধ্বংস!’ ৬৬ বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী ঘিরে তোলপাড়
২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার। তারিখটি যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি আরব গণমাধ্যমে ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে পৃথিবীর ধ্বংস বা মহাপ্রলয়ের একটি পুরোনো ভবিষ্যদ্বাণী। ৬৬ বছর আগে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই তারিখ। তবে গবেষকেরা কি সত্যিই বলেছিলেন, ওই দিন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে? নাকি জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক হিসাবকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক?
১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ তিন গবেষকের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, নভেম্বর ১৩’—অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার, মহাপ্রলয়ের দিন।
গবেষণায় বলা হয়েছিল, প্রায় দুই হাজার বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা যদি একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে গবেষকদের তৈরি গাণিতিক মডেল অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বরে বিশ্বের জনসংখ্যা তাত্ত্বিকভাবে ‘অসীমে’ পৌঁছাবে।
কিন্তু এই হিসাবের অর্থ কি মানবজাতির বিলুপ্তি? ১৩ নভেম্বরের সঙ্গে কি কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় বা পৃথিবীতে প্রাণের অবসান ঘটাতে পারে এমন ঘটনার বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে? বিষয়টি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত সেই গবেষণায়।
যে গবেষণা থেকে ‘মহাপ্রলয়ের’ ধারণা
গবেষণাটির অন্যতম প্রধান গবেষক ছিলেন অস্ট্রীয়-মার্কিন পদার্থবিদ হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক প্যাট্রিশিয়া মোরা ও লরেন্স অ্যামিয়টের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গবেষণাটি তৈরি করেন।
বিশ্বের জনসংখ্যার ঐতিহাসিক বিভিন্ন হিসাবের ওপর ভিত্তি করে গবেষকেরা তাদের বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন। এতে খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার ২৪টি অনুমান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের ধারায় মানবসংখ্যা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন তারা।
গবেষকেরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে কোনো স্থির হারের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। বরং তারা ‘হাইপারবলিক গ্রোথ’ বা দ্রুততর জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। এই মডেল অনুযায়ী, শুধু জনসংখ্যাই বাড়ে না, সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও আরও দ্রুত হয়।
গবেষকদের ধারণা ছিল, মানুষের যোগাযোগ, সহযোগিতা, সামাজিক সম্পর্ক ও জোট গঠনের সক্ষমতা নতুন নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে মানুষ পরিবেশগত কিছু সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে। বাড়ে বেঁচে থাকা ও প্রজননের সক্ষমতাও।
ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর এই সমীকরণ প্রয়োগ করে গবেষকেরা একটি বিশেষ গাণিতিক ফল পান। তাদের মডেল অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সমীকরণটি ‘সিঙ্গুলারিটি’ বা অসীমতার বিন্দুতে পৌঁছাবে। হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়টি ছিল ২০২৬.৮৭।
এই সংখ্যাকে ক্যালেন্ডারের তারিখে রূপান্তর করলে পাওয়া যায় নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়। সেখান থেকেই গবেষণার শিরোনামে উঠে আসে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর।
পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না
গবেষণার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে, গবেষকেরা পৃথিবীর শেষ হয়ে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন।
তারা পৃথিবীর সঙ্গে কোনো গ্রহাণুর সংঘর্ষ, সূর্যের বিস্ফোরণ, ভয়াবহ ভূমিকম্প কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কথা বলেননি। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগে মানবজাতি কবে বিলুপ্ত হবে, সেই তারিখও নির্ধারণ করেননি।
‘ডুমসডে’ শব্দটি তারা ব্যবহার করেছিলেন জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কাল্পনিক গাণিতিক পরিণতি বোঝাতে। তাদের মডেল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রবৃদ্ধির ধারা অপরিবর্তিত থাকলে একপর্যায়ে জনসংখ্যার হিসাব অসীমে পৌঁছাবে। বাস্তব পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি সম্ভব বা যাচাইযোগ্য নয়।
অর্থাৎ, এখানে ‘অসীম’ বলতে পৃথিবীতে বাস্তবে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বোঝানো হয়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেলকে ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত করলে এবং তার সব শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে বলে ধরে নিলে যে ফল পাওয়া যায়, সেটিই বোঝানো হয়েছে।
মূল গবেষণা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গবেষকেরা নিজেরাও পরিবেশ, সম্পদ ও জনসংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলা অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এসব উপাদান জন্মহার ও মৃত্যুহার পরিবর্তন করতে পারে, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিপথও বদলে দেয়।
১৯৬৪ সালের সংবাদপত্রের নিবন্ধ ঘিরে বিতর্ক
সম্প্রতি পুরোনো এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আলোচনার পেছনে ১৯৬৪ সালের একটি সংবাদপত্রের কাটিংও ভূমিকা রাখছে। ২৯ নভেম্বর ১৯৬৪ সালে মিশরীয় সংবাদপত্র ওয়াতানি-তে মিশেল তাকলারের নামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর সমাপ্তির কথা উল্লেখ ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ছয় দশকেরও বেশি সময় পর ওই নিবন্ধের পুরোনো কাটিংয়ের ছবি আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিষয়টি নিয়ে।
তবে সংবাদপত্রের নিবন্ধ এবং মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর তারিখটি যে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, সেটি ১৯৬০ সালে হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার ও তার সহকর্মীরা প্রকাশ করেছিলেন। এটি মিশেল তাকলারের কোনো গবেষণা ছিল না।
তাকলারের নিবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়েও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো কোনো প্রতিবেদনে একে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আবার কোথাও সৌর কার্যকলাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রসঙ্গ এসেছে।
তাই এসব ধারণাকে একত্র করে একটি একক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
একইভাবে মূল নিবন্ধের পূর্ণ পাঠ যাচাই ও বৈজ্ঞানিক উৎসের সঙ্গে তুলনা না করে সেগুলোকে ফন ফোরস্টারের গবেষণার ফলাফল বলারও সুযোগ নেই।
১৩ নভেম্বর কি সত্যিই কোনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে?
২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বরকে ঘিরে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিপদের দাবিগুলো নিয়ে কথা বলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এমাদ মুজাহেদ। তার মতে, চলতি বছর সৌর কার্যকলাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে কয়েক দশক ধরেই পরিচিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা; আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়।
বিবিসিকে মুজাহেদ বলেন, সৌর কার্যকলাপ প্রাকৃতিক চক্র অনুসরণ করে। সৌরঝড় মহাবিশ্বের শুরু থেকেই বিদ্যমান একটি ঘটনা। তবে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে বিজ্ঞানীরা এখন এসব ঘটনা আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ, নজরদারি ও পূর্বাভাস দিতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, ১৩ নভেম্বর এমন কোনো পরিচিত বা প্রত্যাশিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নেই, যা পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা আতঙ্কের কারণ হতে পারে।
গাণিতিক সমীকরণ কিংবা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মডেলের সাহায্যে পৃথিবীর সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণের ধারণাও নাকচ করেন তিনি। তার ভাষ্য, জ্যোতির্বিদ্যা বা মহাকাশবিজ্ঞানে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যা পৃথিবীর শেষ ঘনিয়ে আসার কথা বলে।
মুজাহেদের মতে, ১৩ নভেম্বর নিয়ে যেসব দাবি ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বা কোনো বৈজ্ঞানিক সতর্কতার ওপর ভিত্তি করে নয়। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নানা মাধ্যমে এসব দাবি প্রচার করছে, যার পক্ষে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সব মিলিয়ে, ১৯৬০ সালের গবেষণাটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ—পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী নয়। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তব ধারা বদলে যাওয়ায় সেই মডেলের অনুমানও বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। ফলে ১৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখটিকে ঘিরে মহাপ্রলয়ের যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে, তার পক্ষে কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

