চট্টগ্রামের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি পেলেন জুলাই হত্যা মামলার আসামিরা। এসব পদোন্নতি ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকা, জুলাই হত্যাসহ একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি, গ্রেফতাারি পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকটা গোপনে উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
পদোন্নতি পাওয়ারা হলেন- মো. ফারুক আহমদ, সৈয়দ মোরশেদ উল্লাহ ও কাউছার নুর লিটন। যাদের চাকরি হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের নির্দেশে। চট্টগ্রাম-১০ আসনের এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু ও তার ছোট ভাই বেলাল উদ্দিনের সশস্ত্র হুমকিতে।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর মহিউদ্দিন বাচ্চু পালিয়ে গেলেও তার ছোট ভাই বেলাল উদ্দিন বীরদর্পে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (গনসংযোগ) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। যার নিয়ন্ত্রণে চলছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
মো. ফারুক আহমদ বর্তমানে উপব্যবস্থাপক পদে কর্মরত। তিনি এর আগে সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) ছিলেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় তিনি আসামি। মামলায় তিনি জামিনও নেননি। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী রাজনৈতিক পদে সক্রিয় থাকা নিষিদ্ধ হলেও বিষয়টি গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মো. ফারুক আহমদের বিরুদ্ধে চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করার অভিযোগ রয়েছে। বয়সসীমা পার হওয়ার পর তিনি পিতার নামে দাখিল করা মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুবিধা নেন।
পরে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় যাচাই শেষে সনদটি ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও সে সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার জন্মতারিখ অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়স নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে গত ১ ডিসেম্বর সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) থেকে উপব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন কাউছার নুর লিটন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া স¤পাদক পদে থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সহকারী প্রকৌশলী (কারিগরি) সৈয়দ মোরশেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ কোতোয়ালি, পাঁচলাইশ ও পটিয়া থানায় মোট তিনটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং এসব মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় তার বয়সসীমা অতিক্রম করার বিষয়টিও গোপন করা হয়েছে। তিনি পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক স¤পাদক হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলেন।
কেজিডিসিএলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তার পদোন্নতির পেছনে কর্ণফুলী গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সালাউদ্দিন মাসুদ ও জনসংযোগ কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। পদোন্নতি কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা, বয়স ও রাজনৈতিক স¤পৃক্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই না করে কিংবা গোপন রেখে পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন।
তিনি আরও বলেন, সার্ভিস রুলস ও সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়া, গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা, বয়সসীমা অতিক্রম এবং রাজনৈতিক পদে সক্রিয় থাকা পদোন্নতির ক্ষেত্রে অযোগ্যতার শামিল।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে পদোন্নতি পাওয়া সৈয়দ মোরশেদ উল্লাহ কলটি অন্যত্র ফরওয়ার্ড করে দেন। কাউছার নুর লিটনকে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া মো. ফারুক আহমদ বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মিথ্যা। পদোন্নতিতে একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। মামলার প্রমাণপত্র হাতে থাকার কথা জানালে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দিন আহম্মদ এর অফিসে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বললেন এমডি অনুমতি ছাড়া আমি কথা বলতে পারব না।
এদিকে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (গণসংযোগ) বেলাল উদ্দিনকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
এই বিষয়ে উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য সচিব সালাউদ্দিন মাসুদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন নিয়ম মাপিক পদোন্নতি হয়েছে। এটি একটি রুটিন ওয়ার্ক। এখানে কোন অনিয়ম দুর্নীতি হয়নি। আমি সব সময় স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করি। ভূয়া সনদ দিয়ে চাকুরী করার বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
(শীঘ্রই মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দিন আহম্মদ ও উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য সচিব সালাউদ্দিন মাসুদের অনিয়ম দুর্নীতির খতিয়ান দেখতে চোখ রাখুন দ্বিতীয় পর্বে সাপ্তাহিক পূর্বধারা পত্রিকায়)


