এড‌াব চট্টগ্রাম জেলার “আম‌াজ‌নের হৃদয় থে‌কে বাংলা‌দে‌শের উপকূলঃ কপ৩০ এর অ‌ভিজ্ঞতা” শীর্ষক ‌সেমিনা‌র

পূর্বধারা অনলাইন ডেস্ক:

শেয়ার করুন

এডাব-চট্টগ্রাম জেলা শাখার আ‌য়োজ‌নে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের কারিতাস আঞ্চলিক কার্যালয় মিলনায়তনে প্রত‌্যাশীর নির্বাহী প‌রিচালক জনাব ম‌নোয়ারা বেগম এর সভাপ‌তিত্বে “আমাজনের হৃদয় থেকে বাংলাদেশের উপকূলঃ কপ৩০ এর অভিজ্ঞতা” শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এডাব কেন্দ্রীয় পরিষদের ভাইস চেয়ারপারসন এবং ইপসা’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জনাব ড. মোঃ আরিফুর রহমান।

মূল প্রবন্ধে ড. মোঃ আরিফুর রহমান কপ৩০ আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাজনের গভীর অরণ্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের উপকূল—জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন হলেও এর মূল কারণ ও বৈশ্বিক দায় একই সূত্রে গাঁথা। শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ এবং প্রকৃতিনাশী উন্নয়ন মডেলের ফল ভোগ করছে বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম হলেও এই সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য। অথচ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যার কারণে দেশের উপকূলীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত জীবন ও জীবিকা হারাচ্ছে। এসব বাস্তব অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
ড. মোঃ আরিফুর রহমান কপ৩০ সম্মেলনের আলোকে জলবায়ু ন্যায্যতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কোনো দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়, বরং এটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য অধিকার। তিনি উল্লেখ করেন, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যে অর্থায়ন প্রয়োজন, তা ঋণভিত্তিক হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরও ঋণের ফাঁদে পড়বে। তাই জলবায়ু সহায়তা অবশ্যই অনুদানভিত্তিক ও সহজলভ্য হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কপ৩০ সম্মেলন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—নাগরিক সমাজের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি ছাড়া জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওসমূহের বৃহত্তর সমন্বয়কারী সংগঠন হিসেবে এডাবকে জলবায়ু আন্দোলনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এডাবের নেতৃত্বে নাগরিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবি আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
ড. মোঃ আরিফুর রহমান তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি একটি মানবাধিকার, উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সংকট। উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। তিনি এডাবের সদস্য সংগঠনগুলোকে স্থানীয় বাস্তব অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা, গবেষণা জোরদার করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান।
সবশেষে তিনি বলেন, “আমাজনের হৃদয় থেকে বাংলাদেশের উপকূল—এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রকৃতি ও মানুষের সংগ্রাম আলাদা নয়। জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য এখনই সমন্বিত, সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে নামতে হবে।” তাঁর এই বক্তব্য সেমিনারে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

আরও পড়ুন  একাডেমি কাপ ফুটবলে জুনিয়র টিমের কাছে ধরাশয়ী সিনিয়র টিম

সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিটা’র নির্বাহী পরিচালক জনাব শিশির দত্ত, ইলমা’র প্রধান নির্বাহী জনাব জেসমিন সুলতানা পারু, ওডেব’র প্রধান নির্বাহী জনাব শ্যামলী দত্ত এবং কারিতাস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প‌রিচালক জনাব মার্সেল রতন গুদা।

বিটা’র নির্বাহী পরিচালক জনাব শিশির দত্ত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ধ্বংসের আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেন এবং বলেন, পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মৃৎশিল্পীদের জীবন-জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে।

ইলমা’র প্রধান নির্বাহী জনাব জেসমিন সুলতানা পারু নারী ও শিশুর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বৈষম্যমূলক প্রভাব তুলে ধরে শিশু ও নারীবান্ধব জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

ওডেব’র প্রধান নির্বাহী জনাব শ্যামলী দত্ত বলেন, উপকূলীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় এখনও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না, যা পরিবর্তনে নাগরিক সমাজকে আরও সংগঠিত হতে হবে।
কারিতাস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প‌রিচালক জনাব মার্সেল রতন গুদা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি; তাই বাংলাদেশকে ঋণ নয়, অনুদান দিতে হবে। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের নামে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অনুদানভিত্তিক সহায়তাই হওয়া উচিত ন্যায্য ও টেকসই সমাধান।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন উৎস’র নির্বাহী পরিচালক জনাব মোস্তফা কামাল যাত্রা। তিনি পুরো আয়োজনটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন এবং আলোচনায় প্রাণবন্ততা আনেন।
সেমিনারের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা কপ৩০ সম্মেলনের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারটি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, এনজিওসমূহের পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সভাপতি জনাব মনোয়ারা বেগম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে সেমিনারের আয়োজন ও উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আজকের সেমিনার কেবল কপ৩০ সম্মেলনের অভিজ্ঞতা বিনিময় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষ‌য়ে জানার আ‌য়োজন, যেখানে আমাদের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হলো। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। উপস্থিত সকল বক্তার আলোচনায় উঠে এসেছে—বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ঋণ দিয়ে নয়, বরং অনুদানভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত। আজকের আলোচনার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা আমাদের এনজিও ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয়, ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রেরণা দেবে। স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা একযোগে কাজ করলে জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পথে দৃঢ় ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন  পাহাড় কাটা রোধে ২৬ টি পাহাড়ে সাইন বোর্ড টাঙ্গালেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন
শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন