রামিসা-ফাহিমা-লামিয়া-আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা 

একের পর এক হিংস্রতা ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ

ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ;

শেয়ার করুন

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা। মাত্র শুরু হয়েছে পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাস। সাদা স্কুল ড্রেস পরে ক্লাসরুমে বসে আছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। হঠাৎ সেখানে হাজির হন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। মেয়ের বন্ধুদের বুকে জড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রামিসার সহপাঠীর মুখে পরম আদর মাখা হাতখানি বুলাচ্ছিলেন আর বলছিলেন ‘তোরা আমার রামিসা, বাবা; তোরাই আমার রামিসা।’ শিশুবাচ্চার মতো এভাবে হাউমাউ করে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছিলেন আবদুল হান্নান। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে রামিসার সহপাঠীরাও। তাদের সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা যেন কারও জানা নেই।

নৃশংস এই হত্যাকা-ের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে পল্লবীতে বিক্ষোভ করেন রামিসার সহপাঠী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও পল্লবী থানা ঘেরাও করেন এলাকাবাসী

মাত্র এক সপ্তাহে হারাল চারটি নিষ্পাপ ছোট্ট প্রাণ। পল্লবী থেকে সিলেট পর্যন্ত সব ঘটনায় উঠে এসেছে সমাজের অন্ধকার চিত্র, ধর্ষণ। এরপর হত্যা। এমন ঘটনায় বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। শঙ্কিত অভিভাবকরাও।

রামিসা:

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যা করা হয়েছে ধর্ষণের পর। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে। ২০ মে বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তার জবানবন্দি রেকর্ড করে পাঠানোর নির্দেশ দেন কারাগারে। একই মামলায় অভিযুক্ত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও পাঠানো হয়েছে কারাগারে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯ মে মঙ্গলবার সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। পরে পরিবারের সদস্যরা খোঁজ করতে গিয়ে সোহেল ও স্বপ্নার ঘরে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করেন। পাশেই একটি বালতিতে পাওয়া যায় শিশুটির মাথা। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে দেশ জুড়ে।

আরও পড়ুন  লামায় ৩৩ বছর ধরে দখলে বিদ্যালয়ের দোকান প্লট

ফাহিমা

সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকেও যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবেশী ও সম্পর্কে চাচা জাকির হোসেনকে গত ১৮ মে সোমবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফাহিমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ব্যাগে ভরে পাশের ডোবায় ফেলে দেয় জাকির। গত শুক্রবার শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানা ঘেরাও করে। পরে অভিযুক্তের বাড়িতেও চালানো হয় হামলা।লামিয়া

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে চার বছরের শিশু লামিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নবম শ্রেণির ছাত্র মুরসালিনকে আটক করেছে পুলিশ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার বিকালে শিশুটিকে নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় মুরসালিনকে। সন্ধ্যার পর লামিয়া নিখোঁজ হলে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরদিন সকালে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে মুরসালিন হত্যার কথা স্বীকার করলে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, ‘ধর্ষণের পর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে।

আছিয়া:

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সৎ মামা রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে। শনিবার বিকালে নিজ ঘরের খাটের ওপর শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই রাজা মিয়া ওই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে আটক করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে।

উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে অভিভাবকরা

সাম্প্রতিক এসব ধর্ষণ ও শিশু হত্যার ঘটনা নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বেড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি চিন্তিত। একা স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা প্রতিবেশীর বাসায় যাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলোও এখন অনেক অভিভাবকের কাছে উদ্বেগের কারণ। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে আরও বাড়ছে তাদের আশঙ্কা।

আরও পড়ুন  বাঁশখালীতে নিখোঁজের ২৭ দিন পর পাহাড়ে  যুবকের কঙ্কাল

অনেকেই বলছেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই ভয় ও অনিশ্চয়তা কাটবে না। ফলে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়তি সতর্কতা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ঢাকা উত্তরার বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা ফাওজিয়া খানম বলেন, ‘সন্তানদের এখন একা বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে। স্কুলে যাওয়া, খেলতে যাওয়া, এমনকি পাশের বাসায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। প্রতিদিন খবর খুললেই শিশু নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা দেখি। একজন মা হিসেবে এটা খুবই আতঙ্কের। আমরা চাই, অপরাধীদের এমন শাস্তি হোক যাতে ভবিষ্যতে কেউ শিশুদের দিকে কুনজর দেওয়ার সাহস না পায়।’

ঢাকার পল্লবীর বাসিন্দা ও এক শিশুর বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সন্তান ঘর থেকে বের হলে এখন আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না। আগে ভয় ছিল দুর্ঘটনার, এখন ভয় মানুষ নিয়েই। যারা শিশুদের ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালায়, তাদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে কমবে না অভিভাবকদের এই আতঙ্ক।’

বিশেষজ্ঞদের অভিমত:

শিশু অধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান মাহবুবা রহমান কাকলির ভাষ্য, ‘সাম্প্রতিক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় কারণ। অধিকাংশ ভুক্তভোগী নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখছে।’

‘গত দেড় বছরে বহু শিশু ধর্ষণের ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু রাষ্ট্র নয়, পরিবার, সমাজ, স্কুল ও প্রতিবেশীকেও সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

মাহবুবা রহমান কাকলি বলছেন, ‘শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক শিক্ষা জরুরি। একই সঙ্গে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিশেষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি কার্যকর করা গেলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে অনেকাংশে।’

আরও পড়ুন  ভিতরগড় সীমান্তে ভারতে প্রবেশের চেষ্টাকালে তিন বাংলাদেশিকে আটক

 

বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। এই আইনজীবী বলেন, ‘বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী বিচার পাওয়া সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে অনেক মানুষই সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

 

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। তদন্ত ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। পর্যাপ্ত ডিএনএ ল্যাব ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার অভাবে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তৈরি করছে হতাশা’, যোগ করেন ইশরাত হাসান।

তার ভাষ্য, ‘নিজের মেয়েকে হারানোর পরও যখন একজন বাবা বললেন, ‘আমি বিচার চাই না’, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। কিছু মামলা দ্রুত বিচার হলেও উচ্চ আদালতে মামলা জটের কারণে বছরের পর বছর লেগে যায়, ফলে বিচার বিলম্বিত হয়।’

বিচারটা সঠিকভাবে করা গেলে অপরাধের মাত্রা অনেকাংশই কমবে বলে মনে করেন ইশরাত হাসান। তার মতে, দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে ভয় পাবে অন্য অপরাধীরাও। কিন্তু বিচার পাচ্ছে না মানুষ।

‘দেশে পর্যাপ্ত বিচারক ও আদালত নেই। প্রতিটি জেলায় ডিএনএ ল্যাব থাকা দরকার। তদন্তের জন্য বিশেষ এজেন্সি দরকার, যারা শুধু ধর্ষণ মামলাগুলো তদন্ত করবে’— অভিযোগের সুরে বললেন আইনজীবী ইশরাত।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন